সাঁওতাল: মানব সভ্যতার আজন্ম সংগ্রামী ভূমিপুত্ররা | শেষ পর্ব

55
সাঁওতাল: মানব সভ্যতার আজন্ম সংগ্রামী ভূমিপুত্ররা | শেষ পর্ব

প্রথম পর্ব: সাঁওতাল: মানব সভ্যতার আজন্ম সংগ্রামী ভূমিপুত্ররা | ০১

গোলাম সারোয়ার

সাঁওতালরা ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্রোহটি করে ৩০শে জুন ১৮৫৫ সালে। সহজ, সরল, নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় সাঁওতাল আদিবাসিরা সেদিন ভারত বর্ষে জেগে উঠেছিল। জ্বালিয়ে ছিলো প্রতিবাদের দাবানল। সাঁওতাল বিদ্রোহ হয় মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায়। এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় সিধু, কানু, চাঁদ এবং ভৈরব প্রমুখ। ১৮৫২ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ হলো ভারতবর্ষে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত বিদ্রোহ। তার পরের মহাবিদ্রোহ হলো সিপাহি বিদ্রোহ।

সাঁওতাল বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ সৈন্য ও তাদের দোসর অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। সাঁওতাল হুলের ইতিহাস হতে জানা যায় দামিন-ই কোহ ছিল সাঁওতালদের নিজস্ব গ্রাম। তারা বলতো নিজস্ব দেশ।১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে জুন প্রায় ত্রিশ হাজার সাঁওতাল কৃষক বীরভূমের ভগনাডিহি থেকে সমতলভূমির উপর দিয়ে কলকাতা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে। ভারতের ইতিহাসে এটাই প্রথম গণপদযাত্রা। ৭ই জুলাই দিঘি থানার মহেশলাল দারোগাসহ ১৯ জনকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। বিদ্রোহের নায়ক সিধু ও কানু তাদের ভাষায় ডাক দেন, ‘রাজা-মহারাজাদের খতম করো, নিজেদের শাসন কায়েম কর’। তাদের ডাকে সাঁওতাল কৃষকরা ছাড়াও কুমার, তেলী, কর্মকার, চামার, ডোম, মোমিন সম্প্রদায়ের গরীব মুসলমান ও গরীব হিন্দু জনসাধারণ বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটিই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। সাঁওতালরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইংরেজ বাহিনীর হাতি, ঘোড়া, বন্দুক ও কামানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। সাঁওতাল বিদ্রোহের লেলিহান শিখা বৃটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে তা শেষ হয়।

সিদু-কানুকে ষড়যন্ত্র করে ধরিয়ে দেওয়া এবং হত্যার পরই স্তিমিত হয়ে পড়ে বিদ্রোহ। এই যুদ্ধে আদিবাসী সাঁওতাল নারীরাও সর্বস্ব নিয়ে যুদ্ধে নামে। সিদু-কানুর বোন ফুলমনিও এই যুদ্ধে শহীদ হন। এই ফুলমনিকে নিয়ে আদিবাসী সাঁওতালদের গান রয়েছে। বিদ্রোহের ফল হিসেবে ভাগলপুর ও বীরভূমের কিছু অংশ নিয়ে ৫,৫০০ বর্গ মাইল জুড়ে এবং প্রথমে দেওঘর ও পরে দুমকায় প্রধান কার্যালয় নির্দিষ্ট করে সাঁওতাল পরগণা গঠন করতে ইংরেজরা বাধ্য হয়। এই পরগণাকে অনিয়ন্ত্রিত বা নন-রেগুলেটেড একটি জেলা ঘোষণা করা হয়। ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করেন। ম্যাজিস্ট্রেট এডন সাঁওতালদের আবেদন শুনেন।

সাঁওতালরা সহজ সরল তবে লড়াকু জাতি। জীবন সংগ্রামই তাদের চলার পথের পাথেয়। সিধু, কানুর সাঁওতাল বিদ্রোহের অনেক আগে থেকেই সাঁওতালরা সংগ্রাম করে আসছে। প্রথমত মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই তারা পৃথিবীর পথে পথে সংগ্রাম করেই নিজেদের অস্তিত্ব আজো টিকিয়ে রেখেছে। আর ইংরেজ আমলে তাদের সংগ্রাম মূলত তাদের স্বর্গ তাদের গ্রাম দামিন-কে নিয়ে। বহু কষ্ট করে জঙ্গল কেটে সে বন সাফ করে তারা এই জনপদ গড়ে তুলেছিল। ১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে দেওয়ানী লাভ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারপর বাংলা, বিহার, ওডিশ্যার আদিবাসীদের কষ্টার্জিত জমি বিভিন্ন আইনি জালে জড়িয়ে তারা কেড়ে নিতে শুরু করে। জোতদার-জমিদার, ভূস্বামী, মহাজন এবং কোম্পানির কর্মচারীদের লোভাতুর দৃষ্টি পড়ে সাঁওতাল রমণীদের উপর। এসব অন্যায়-অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের মধ্যে অস্ত্র হাতে প্রায় গর্জে উঠেছিল সাঁওতাল আদিবাসীরাই।

আদিবাসী সাঁওতালদের বিদ্রোহ শুধু একবার নয়, ঘটেছে বার বার। ১৭৯৭, ১৭৯৮, ১৭৯৯, ১৮০৭, ১৮৩১-১৮৩২, ১৮৫৫-১৮৫৬, ১৮৭৪-১৮৭৫, ১৮৮০-১৮৮১ এবং ১৯০০ সালে। সিধু, কানু-রা যে মহান সাঁওতাল নেতার উত্তাপ থেকে সংগ্রামে প্রণোদিত হয়েছিলো তিনি হলেন ১৭৮০ সালের ভাগলপুরের সাঁওতাল নেতা বাবা তিলকী মুর্মু । এই মহান সাঁওতাল নেতা তৎকালীন বিহার রাজ্যের ভাগলপুর জেলার তিলকপুর গ্রামে ১৭৫০ সালে জন্মগ্রহন করেন। অগাস্টাস ক্লিভল্যান্ড ভাগলপুরের কালেক্টর নিযুক্ত হয়েছিলেন ১৭৯৯ সালে। রাজমহল পর্বতমালার পাদদেশের ‘দামিন-ই-কোহ্‌’ অঞ্চলটি ইংরেজ আমলের সৃষ্টি। ইংরেজরা সাঁওতালদের লোভ দেখালো এই জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলটি পরিস্কার করে মানব বসতি স্থাপন করতে পারলে সাঁওতালরা এলাকাটি ভোগ করতে পারবে। বলা হয়েছে প্রথম তিন বছর কোনো খাজনা দিতে হবে না, পরে লাগলেও তা হবে যৎসামান্য। এই প্রতিশ্রুতিতে কটক, ধলভূম, মানভূম, বরাভূম, ছোটনাগপুর, পালামো, হাজারিবাগ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম প্রভৃতি এলাকা থেকে সাঁওতালদের এনে দামিনকে জনপদ উপযোগী করা হলো। তারপরে ব্রিটিশরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। জমির উপর ধার্য করা হলো উঁচু খাজনা। খাজনা বৃদ্ধি ছাড়াও সাঁওতাল রমণীদের উপর অপদৃষ্টি! এসব ঘটনায় সাঁওতালরা বিক্ষুদ্ধ হতে থাকে অন্তর্লোকে। এসব ঘটনা তিলকী মুর্মুকেও বিক্ষুব্ধ করে। তিনি তখন সাঁওতালদের নিয়ে গঠন করলেন ‘মুক্তি বাহিনী’।

জাত নেতা তিলকী মুর্মু নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি আখড়া। সেখানে গ্রামের সমস্ত যুবককে তিনি তীর, টাঙ্গি, তলোয়ার চালানোর শিক্ষা দিতেন। ১৭৮৪ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি অত্যাচারী ক্লিভল্যান্ড ঘোড়ায় চেপে বনের রাস্তা দিয়ে যখন বাড়ি ফিরছিলেন সে সময় তিলকি মুর্মু বাটুল মেরে ক্লিভল্যান্ডকে মাটিতে ফেলে তার বন্দুক নিয়ে সে বন্দুকের আঘাতেই তাকে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের দায়ে তিলকীকে গ্রেপ্তার করে ভাগলপুরের প্রকাশ্য মাঠে ফাঁসি দিয়েছিল। ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত ইংরেজদের বিরুদ্ধে লাগাতার এ লড়াই চলে এবং সাঁওতালদের প্রথম শহীদ বাবা তিলকী। তিনিই সিধু, কানুদের আত্মিক নেতা, আন্দোলনের চেতনা। সেই চেতনার পথ ধরে সিধু কানুর ডাকে ১৮৫৫ সালের ৩০শে জুনের রৌদ্রদগ্ধ উত্তপ্ত দিনে বনজঙ্গল, পাহাড়তলি থেকে পিপীলিকার ন্যায় সাঁওতাল জনজাতির স্রোত এসে মিশে ছিল ভগনাডিহির মাঠে। সাঁওতালরা ব্রিটিশ কামান বন্দুককে পরোয়া না করে পাঁচটি জেলায় স্বাধীন রাজত্ব কায়েম করে এবং প্রায় দেড় বছর এই বিদ্রোহ ধরে রাখে। ভারতবর্ষে, বাংলাদেশের সা‍‌হিত্যে, সংগী‍‌তে জাতীয়তাবাদের অভ্যুদয় হয়নি যখন; জাতীয়তাবাদ, জাতীয় জাগরণ প্রভৃতি কথাগুলিও কেউ উচ্চারণ করেনি যখন, তখন সাঁওতালরাই তা করে দেখিয়েছিলো। তখন সাঁওতাল পরগনায় দুমকা, গোড্ডা, রাজমহল এবং পাকুড় এলাকায় চারটি দামিন ছিল।

সর্বশেষ সাঁওতাল রক্তের উত্তাপ আমরা দেখলাম গত ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধায়। এদিন সাঁওতালদের দেড় হাজারের মতো বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের প্রতিবাদে, প্রতিরোধে এবং ভূমিরক্ষায় তিনজন সাঁওতাল জীবন দেন। জীবন দিতে হাতে তীর তুলে নেন সমস্ত সাঁওতাল মানব মানবী। সাঁওতালরা দাবি করছে, তাদের বাপ-দাদার এসব জমি ১৯৬২ সালে চিনিকলের জন্য ইজারা নিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। সাঁওতাল ও বাঙালিদের কাছ থেকে ইজারা নেওয়া ১৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি দেওয়া হয় চিনিকল কর্তৃপক্ষকে। সেই জমিতে সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১৮টি গ্রাম ছিল। ইজারার সেই কাগজপত্রও তাদের কাছে আছে। ইজারা নেওয়া জমিতে আখচাষের জন্য গড়ে তোলা হয় সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার। ওই চুক্তির ৫ নম্বর শর্তে উল্লেখ আছে, ইজারা নেওয়া হলেও কখনো যদি আখচাষের কাজে জমি ব্যবহার করা না হয়, তাহলে এসব জমি চিনিকলের কাছ থেকে সরকারের কাছে ফেরত যাবে। পরবর্তী সময়ে সরকার জমি আগের মালিকের কাছে ফেরত দেবে। আর চিনিকল কর্তৃপক্ষের দাবি, ইজারা নয়, এসব জমি সে সময় অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। সাঁওতালরা বলছে, লোকসানের কথা বলে মাঝে ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধও করে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালে এটি আবার চালু করা হয়। অথচ এখন এসব জমিতে মিলের জন্য আখচাষ না করে ধান, তামাক ও শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে। কিছু জমি চিনিকল কর্তৃপক্ষ চাষাবাদের জন্য অন্য লোকদের কাছে ইজারাও দিয়েছে। এর মাধ্যমে মিল কর্তৃপক্ষ ইজারার চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের এই ঘটনায় বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটে একটি অতি উচ্চমাত্রার গুরুত্ব আছে। বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত হচ্ছে। প্রতিটি দেশের কায়েমি স্বার্থবাদী আর ভূমিদস্যুরা সংখ্যালঘুদের উপর জাতিগত নিপীড়ন করে ধর্মের নামে। এগুলো এ কারণে করে যে, অত্যাচারে আর নিগৃহে দিশেহারা হয়ে ঐসব সংখ্যালঘু যেন দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। বলা বাহুল্য ধর্মের নামে এগুলো করলেও এগুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিষ্ঠাবান ধার্মিকরা জড়িত নয়। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো করে স্বার্থবাজ ভূমিদস্যুরা। সাঁওতালরা যা করলো তা হলো শক্তির প্রতীক। যখন ব্রিটিস সাম্রাজ্যের সূর্যষ অস্ত যেতনা পুরো বিশ্বে তখনও ব্রিটিসদের বিরুদ্ধে যৎসামান্য সাঁওতাল রুখে দাঁড়ানোর শক্তি দেখাতে পারলো। আর গোবিন্দগঞ্জেও তারা তীর ধনুক নিয়ে প্রতিরোধে দাঁড়ালো। সংখ্যালঘুদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। যেই ভূমিতে যার দেশ সে কেন দেশ ছেড়ে অন্যদেশে পরবাসী হবে ! বাংলাদেশে হিন্দুরা আর মিয়ানমারের রোহিঙ্গারাও সাঁওতালদের এই শক্ত চোয়াল আর ক্ষত্রিয়সম বুকের নিঃশ্বাস থেকে সাহস নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে নিজ ভূমে। পারবে বিশ্বের সব নিপীড়িত নিগৃহিত জাতি জীবন দিয়ে জীবন-মান-ভূমি রক্ষা করার শক্তি অর্জন করতে। এই সাহসী, বৈচিত্রময় আদিবাসী ভূমিপুত্রদের রক্ষা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে আমাদের জন্যে। রক্ষা করতে হবে পৃথিবীর আশা টিকিয়ে রাখার জন্যে।

গোলাম সারোয়ার: কলাম লেখক।
২২শে নভেম্বর, ২০১৬

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: