শ্রদ্ধাঞ্জলি: মুক্তিযুদ্ধের জর্জ বাহিনী প্রধান জর্জ দাস

160
bdtruenews24.com

আজহারুল আজাদ জুয়েল

১৫ জুন মি. জর্জ দাসের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে জীবন যুদ্ধে অনেকটা পরাজিত হয়ে মহাপ্রয়াণে চলে গেছেন দিনাজপুরের প্রখ্যাত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বপুর্ণ অবদানের কথা এই জেলার মানুষ যেমন জানেন, তেমনি দেশের অন্যন্য অঞ্চলের মানুষেরও খুব একটা অজানা নয়।

জর্জ দাস সকলের কাছে জর্জ ভাই নামে পরিচিত ছিলেন। অথচ দুর্ভাগ্য যে, আমরা এখন জর্জ ভাইকে ভুলতে বসেছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দিবসে-অ-দিবসে কত আলোচনা হয় কিন্তু জর্জ ভাইয়ের নাম কেউ মুখেও তোলেন না এখন!

দিনাজপুরে জর্জ দাসের নেতৃত্বাধীন মুক্তি বাহিনী পরিচিতি পেয়েছিল ‘জর্জ বাহিনী’ নামে। তাদের দুঃসাহসিকতার কারণে পাকিস্তানি বাহনী সর্বদা তটস্থ থাকত। রামসাগর, ঘুঘুডাঙ্গা, মোহনপুর, বিরল সহ বিভিন্ন এলাকায় জর্জ বাহিনীর অপারেশনে অনেক পাক সেনার প্রাণ যাওয়ায় জর্জ বাহিনী নামটা বেশি করে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের কারণে পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে আতংক এমনভাবে বিরাজ করত যে, তারা যখন তখন ম্যুভ করার সাহস দেখাত না।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু জর্জ দাস সারা জীবন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাথে। মুক্তিযুদ্ধের পর যে বিছানায় ঘুমাতেন সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালে ব্যবহৃত একটি কম্বল বিছিয়ে রাখতেন। কম্বলটি হাতছাড়া করতেন না কখনো। অতি ব্যবহারে ব্যবহারের অনুপযোগি হয়ে গিয়েছিল। একবার কম্বলটির অংশ বিশেষ পুড়েও গিয়েছিল। এরপরেও এটাকেই তিনি তার বিছানায় বিছিয়ে রাখতেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মারক হিসেবে। মৃত্যুর সময়কাল পর্যন্ত একাত্তরের এই স্মারক সঙ্গে নিয়েই ঘুমাতেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ যার জীবনের শ্রেষ্ঠ ভালবাসা, সেই জর্জ দাস জীবনের বেশির ভাগ সময় অভাব-অনটনে জর্জরিত ছিলেন। বার্ধক্যজনিত অসুস্থ্যতায় ভুগে মারা গিয়েছিলেন অনেকটা বিনা চিকিৎসায়। সান্তনা এটাই যে, অন্য কিছু না পেলেও মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছিলেন। জাতীয় পতাকা কিছুক্ষণ ঢেকে রাখা হয়েছিল তার লাশ। দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল বিউগলের করুণ সুরে।

দিনাজপুর জেলা শহরের মিশন রোড নিবাসী জর্জ দাশ, পিতা মৃত পিটার ডিসি দাস মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে একজন অবসরপ্রাপ্ত ইপিআর সৈনিক ছিলেন। তিনি ইপিআর বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। উনসত্তুরের (১৯৬৯) গণ অভুত্থানের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী কূট-কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাঙালি সৈনিকদের বিরুদ্ধে অঘোষিত পদক্ষেপ নেয়া শুরু করলে সাহসী সৈনিক জর্জ দাসের ভাগ্যেও বিপর্যয় নেমে আসে। ১৯৬৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। এটা চাকুরীজীবী হিসেবে অবমাননাকর। তবে এক দিক দিয়ে ভালই হয়েছিল তাঁর জন্য। মুক্তিযুদ্ধে পুরোমাত্রায় কাজে লাগাতে পেরেছিলেন তার এই নতুন জীবনকে।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এতদ সত্বেও তৎকালিন শাসক গোষ্ঠী বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার পরিপ্রেক্ষিতে সারাদেশে শ্লোগান ওঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ সেই আহ্বানে সাড়া দেয় দেশের মানুষ। বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ডামি রাইফেলে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। দিনাজপুর জেলা এর ব্যতিক্রম ছিল না। বিশেষ করে ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর’ বলার পর দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে যুবকদের মধ্যে অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রবনতা দেখা দেয়। যারা তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতেন তাদের অন্যতম ছিলেন জর্জ দাস। তিনি কেবিএম কলেজে ডামি রাইফেলের সহায়তায় যুবকদের সামরিক ট্রেনিং দিতেন। এরপর অল্পদিনের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ দিনাজপুরের বীর জনতা পাকিস্তানি সেনাদের অন্যতম ঘাঁটি কুঠিবাড়ি বা ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টার দখল করে নেয়। এই দখলদারিত্বে জর্জ দাস তার স্বেচ্ছা সেবকদের নিয়ে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কুঠিবাড়ি দখলের পর দিনাজপুর শহর থেকে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়। এর ফলে জেলা সদর মুক্তঞ্চলে পরিণত হয়।

এর ক’দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী আবারো সৈয়দপুর হতে দিনাজপুর শহরের দিকে অগ্রাভিযান শুরু করলে জর্জ দাস কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে প্রথমে ভূষিরবন্দর, পরে দশমাইলে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। একই সময়ে আরো কয়েক হাজার মানুষ পাকিস্তানিদের অগ্রাভিযানে বাধা দেয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু শত্রু বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের সামনে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল দিনাজপুর শহর আবারো হানাদারদের দখলে চলে যায়। এমতাবস্থায় অন্য অনেকের মত ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন জর্জ দাস এবং সীমান্ত সংলগ্ন হামজাপুর-শিবপুর এলাকায় মুক্তিকামী যুবকদের সংগঠিত করতে থাকেন। এখানে ৪ শ’ যুবকের সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গড়ে তোলেন। এই দল পরে মুজিব নগর সরকারের ৭নং সেক্টরের আওতায় কার্যক্রম শুরু করে এবং ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ ভাবে জর্জ বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। কাগজে-কলমে জর্জ বাহিনী না থাকলেও জর্জ দাসের নেতৃত্বাধীন মুক্তি বাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযানে পাকিস্তানি হানাদারদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়, যা যুদ্ধকালিন পরিস্থিতিতে বাঙালিদের মনোবল ও আত্মবিশ^াস বাড়াতে অবদান রাখে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের ফেলে যাওয়া, পুঁতে রাখা, লুকিয়ে রাখা অস্ত্র উদ্ধারেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য জর্জ দাস ২০০০ সালে ঢাকার দিশারী ফাউন্ডেশন কর্তৃক দিশারী সম্মাননা এবং ২০০৮ সালে দৈনিক তিস্তা কর্তৃক তিস্তা পদক লাভ করেন।

দিশারী ফাউন্ডেশন জর্জ দাশকে সম্মাননা দেয়ার কারণ উল্লেখ করে একটি স্মারক পত্র দিয়েছিল জর্জ দাসকে। ফাউন্ডেশন সভাপতি সুধীর অধিকারী স্বাক্ষরিত সেই স্মারক পত্রের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জর্জ দাস সম্পর্কে যে মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়, আমার কাছে সেটি যথার্থ ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে। তাই সেই মূল্যায়ণ পাঠকদের জানার স্বার্থে তুলে ধরা হলো;

‘মুক্তিযোদ্ধা জর্জ দাশ দেশের গৌরব, খৃষ্টান সমাজের গর্ব। তাঁর দেশপ্রেম ও সাহসিকতা নবপ্রজন্মের কাছে একটি অনুপ্রেরণা। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের সেই উদাত্ত আহ্বানে মাতৃভূমিকে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করার জন্য সবকিছু ছেড়ে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জর্জ দাশ। দিনাজপুর শহরের অধিবাসী জর্জদাশ তদানীন্তন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস এ চাকুরী করতেন। দক্ষ সেনাপতির মত অতি দ্রুত তিনি একটি যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তি বাহিনী ইউনিট গড়ে তোলেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মি. জর্জ দাসের প্রশিক্ষণ দেয়া বাহিনী ৭ নম্বর সেক্টরের, ৪ নং উপ সেক্টর হামজাপুর-শিববাড়ি এলাকায় জর্জ বাহিনী নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অসম সাহসী ও ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধা মি. জর্জ দাস তার বাহিনী নিয়ে ৪ নম্বর উপ সেক্টরে, হামজাপুর-শিববাড়ি মূল মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটে যোগ দেন ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যে দীর্ঘ ৯ মাস মরণপণ রক্তযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তিনি তার পূর্ণ অংশীদার। দখলদার বাহিনী কর্তৃক পুঁতে রাখা হাজার হাজার স্থল মাইন অপসারণের বিপদপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি তাঁকে নিতে হয়। অসীম ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে দিনের পর দিন, তিনি স্থল মাইন অপসারণের কাজ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজ সেবক মি. জর্জ দাস খ্রীষ্টান সমাজের তথা দেশের একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ গোটা খ্রীষ্টান সমাজকে গৌরবাম্বিত করেছে। দিশারী ফাউন্ডেশন মি. জর্জ দাশকে দিশারী ঘোষণা করছে।’

এভাবে অনেক সম্মান ও মর্যাদা অর্জিত হলেও বীর মুক্তিযোদ্ধা জর্জ দাসের অর্থনৈতিক অবস্থা কখনো ভাল ছিল না। অর্থ কষ্ট দূর করতে তিনি বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন। প্ল্যান ইন্টারন্যশনাল নামের একটি এনজিওর রানীরবন্দর ইউনিটে বছর কয়েক নাইট গার্ডের চাকুরীও করেছেন। তাঁর মৃত্যুর আগের থেকে সরকার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চালু করেছিলেন। মৃত্যু কালে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জর্জ দাসের মাসিক ভাতা ছিল মাত্র ৯০০ টাকা।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ডরথী ঝরনা রানী দাস, পুত্র সিমসন দাস, ৪ কন্যা রীনা, চন্দনা, সাথী ও সিমথিয়াকে রেখে যান। স্ত্রী ডরথী ঝরনা রানী দাস দুঃখ প্রকাশ করে একদিন বললেন, মাত্র ৭ বছর হলো জর্জ ভাই মারা গেছেন। এর মধ্যেই সবাই কেমন করে যেন তাঁকে ভুলে গেছে। এত প্রোগ্রাম হয় কিন্তু তাঁর নাম কেউ মুখে আনে না!

জর্জ দাশ কোন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের থেকে যুবকদের ট্রেনিং দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে নিজেই ক্যাম্প খুলে যুবকদেরকে সংগঠিত করে অস্ত্র ট্রেনিং দিয়েছেন। পরে মুজিব নগর সরকারের আওতায় তার বাহিনীকে সম্পৃক্ত করে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেছেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক বছরে তাঁকে মানুষ ভুলে যায় কেমন করে? সেই প্রশ্ন আমারো।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...