শেখ হাসিনার কী বয়স বেড়ে যাচ্ছে… | সিদ্ধার্থ টিপু

589
bdtruenews24.com

মহারাজ ঈশা খাঁ সোনার গাঁয়ের মসনদে আরহণ করে প্রথম বার্তাটি প্রেরণ করেছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি আকবরকে। সম্রাট আকবর প্রধান সেনাপতি মানসিংহকে দরবারে তলব করলেন। সৈন্য-সামন্তের খোঁজখবর জানতে চাইলেন। সেনাবাহিনীর মজুদে থাকা গোলাবারুদ এবং কতো দ্রুত অভিযানে সক্ষম তার একটি সম্ভাব্য দিনক্ষণও জানতে চেয়েছিলেন। সন্দেহ নেই, নিকট বৃহৎ শক্তির অনুকম্পা প্রত্যাশাই ছিল সে বার্তা প্রেরণের উদ্দেশ্য।পরের ইতিহাস অবশ্য অনেকের জানা।

ঢাকার ছায়ানটে একটি বেসরকারী টেলিভিশন কতৃক আয়োজিত সেমিনারে ড. এমাজউদ্দীন আহমদকে বলতে শোনা গেলো, বাঙালির সাড়ে চার হাজার বছরের ইতিহাস জানা যায়। আমাদের দৈন্যদশার দিকটি যেমন প্রকট আদি থেকে, সেই অর্থে আমাদের অর্জনের দিকটি ততোধিক উজ্জ্বল নয়। তবে আধুনিক বাংলাদেশে আমাদের অভ্যুদয় পর্বটি অর্থাৎ স্বাধীনতার সংগ্রামটি গত সাড়ে চার হাজার বছরের ইতিহাসে সবচে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। মূলত এই আমাদের জাতিগত সর্বাধিক উজ্জ্বলতম ইতিহাস। তবে ইতিহাসের কদর্য দিকটিও রচিত হয়েছে বারবার। শেষ বাক্যটিতে তিনি সম্ভবত ১৫ই আগস্ট উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে থেমে যেতে হয়েছিল। কারণটি স্পষ্ট। একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ তাঁকে বহন করে চলতে হয়। ফলে সে বিবেচনায় সব সত্য সর্বস্থলে প্রকাশ শোভনীয় না।

সমকালীন বাংলা ভাষায় বিশেষ করে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ‘পালাক্রম’ শব্দটির একটি বিশেষ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ‘ধর্ষণ’ শব্দটির আগে সম্ভবত এরচে যুতসই শব্দ আর বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়টি নেই। পালাক্রমের সঙ্গে ধর্ষণ শব্দটির এমনই যুগল ঐকতান সৃষ্টি হয়েছে যেন শব্দ দুটি একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ শোনায়। ধর্ষণের সঙ্গে যৌনতা আদৌ সম্পর্কিত কিনা তা নিয়ে অবশ্য ঢের বিতর্ক আছে। তবে ধর্ষণ যে অতি নিকৃষ্ট মনোবিকলনজনিত যৌনাচার তা নিয়ে ধর্ষক বৈ অন্য কারো দ্বিমত থাকার কথা না।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অবশ্য পালাক্রমের আরো একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ খুঁজে দেখা যায়! শীর্ষ দুই নেত্রী ফি-বছর পালাক্রমে হজে যাচ্ছেন। মসনদে আরোহনের নিয়ত করে পান করে আসছেন জমজম কূপের পানি। হজরে আসোয়াদে অবশ্য চুম্বন করতে দেখা যায়নি কেউকে, পাছে জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তো থেকেই যায়। লক্ষ-কোটি মানুষের ঠোঁটের ঘষায় কথিত বেহেস্তের ঐ পাথরে ক্ষয় ধরেছে বহু আগে। সেকালে বেহেস্ত থেকে অজ্ঞাতনামা এক ফেরেস্তা পাথর বয়ে এনেছিলেন। একালে তা সম্ভব না, স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে নানান ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস সর্বত্র। ফলে কোনো ফেরেস্তা ঝুঁকি নিতে রাজি হবেন বলে মনে হয় না।

বিশেষ এক বাহন হিসেবে রূপবতী নারীমুখ সদৃশ ‘বোরাক’ এর কথা শোনা যায়। ‘জার্নি’ শেষে বোরাক আবার বেহেস্তে ফিরে গেলো। অভাগা পাথর পড়ে রইলো পাপের পৃথিবীতে। সে পাথরে হুমড়ি খেয়ে পাপী মমিনগণ চুমু খেতে থাকলো। চুমু খাওয়ার ইতিহাস অবশ্য খুব বেশি প্রাচীন না। না জানি থাকলে বোরাক তার কি দশা হতো! বোরাকমণিকেও নিশ্চয় পালাক্রমের উপমায় আখ্যায়িত করা ছাড়া উপায় থাকতো না।

চুমুর যে গতি তাতে অল্প সময়ে হজরে আসোয়াদ নিশ্চিহ্ন হওয়ার কথা, ফলে অচিরেই হয়তো সেখানে ক্ষয়রোধক কোনো সিন্থেটিক পাথর স্থাপন করতে দেখা যাবে। তবে দীর্ঘ টানেল পাড়ি দিয়ে শয়তানকে পাথর ছুঁড়তে যেতে দেখা গেছে আরেক নেত্রীকে। এক্ষেত্রে অবশ্য শেখ হাসিনা খানিকটা বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি শয়তানকে অদৃশ্যে এবং অহেতু পাথর ছোঁড়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন নি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে বার বারই বলতে শোনা যাচ্ছে ‘মদিনা সনদ’ অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবেন।

তিনি কি বাংলাদেশকে ১৪শ’ বছর আগে ফিরিয়ে নিতে চাইছেন! নাকি এ তাঁর সস্তা রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। অথবা হতে পারে তিনি বয়সের ভারে নত হতে শুরু করেছেন। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের জীবন ও মৃত্যুভাবনার মধ্যে বেশ খানিকটা তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে পাশ্চাত্যে বয়সের ভারে ধর্মাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা খুব একটা চোখে পড়ে না। যদিও ধর্ম কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমাকে চিহ্নিত করে দেয়নি ধার্মিক হওয়ার জন্যে। বরং যেকোনো বয়সেই ধর্ম অপরিহার্য। যেমন মৃত্যু যেকোনো বয়সেই ঘটমান বাস্তবতা। তথাপি প্রাচ্যের মানুষের মাঝে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুভীতি ও ধর্মপ্রীতি প্রবলতর হতে দেখা যায়। পাশ্চাত্যের মানুষ বার্ধক্যে এসে শারিরীক অবস্থার উপর নির্ভর করে ডাক্তারের পরামর্শে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

ঢাকার সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মাদ হানিফ প্রেসক্লাবে আয়োজিত কোন একটি রাজনৈতিক সেমিনারে বক্তব্য রাখছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর সেদিনের উচ্চারিত কথাগুলোর মধ্যে কিছু উক্তি ছিল এমন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ বলে কিছু নেই। আওয়ামী লীগকে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ মুসলমানের দল।’ এ বক্তব্যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা সেসময় বিব্রত বোধ করলেন। অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, এটা হানিফ ভাইয়ের ব্যক্তিগত বক্তব্য। উনার বয়স হয়েছে…..।

যতীন সরকার প্রায়শই তাঁর বিভিন্ন জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতায় প্রমথ চৌধুরীর একটি ভারি মজার ও অন্তদর্শীমূলক উদ্ধৃতি শোনাতেন। ‘সমাজের অধিক সংখ্যক মানুষের মনোরঞ্জন করতে হলে সাহিত্য তার স্বধর্মচ্যুত হবে’। শেখ হাসিনার কথা-উদ্ধৃতি-বক্তব্যও কি অনুরূপ? তিনি সমাজের অধিক সংখ্যক মৌলবাদী মানুষের মনোরঞ্জনে সচেষ্ট হয়ে আছেন? তবে তো তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের স্বধর্মচ্যুতি ঘটে যাওয়ার কথা। তাঁকে একবার নব্বই এর দশকের শেষভাগে আকস্মিকভাবে অতি পর্দানশীন হতে দেখা গেছে। মক্কা-মদিনা হিজরত শেষে তিনি হিজাবধারী হয়ে দেশের মাটিতে পা রাখলেন। দু’হাত তুলে প্রার্থনারত ছবি পোস্টারও শোভা পেয়েছিল খুব সে সময়। পরবর্তীতে অবশ্য বহিরাঙ্গ থেকে হিজাব দূর করতে সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু অন্তরে লেপন করে নিয়েছেন মদিনা সনদ।

বিস্ময়কর হলো, সউদি আরব কোরান-সুন্নাহ, মদিনা সনদের বাইরেও তারা নিত্যনতুন সংস্কারের দিকে যাচ্ছে। নারীরা এখন স্টিয়ারিং-এ হাত রাখছেন। সরকারকে তুষ্ট রেখে কবিতা গল্পও রচনা করা যাবে। মদ পানের হার এ বছরও স্থিতিশীল আছে। বিশ্বে মাথা পিছু মদপানের হারে তারা প্রথম স্থানে। নারীদের সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত বোরকার নিচে উচ্চমূল্যের শ্যাম্পেন বা ভোদকার বোতলও শোভা পাচ্ছে। সরকারের কোরানি শাসন বলছে, তা যেন প্রকাশ্যে দেখা না যায়।

অন্যদিকে আমাদের সর্বাঙ্গ ডিজিটাল হচ্ছে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নির্ভর আমাদের শরীর হবে রবোটিক। অল্পকিছুদিনের মধ্যে আমরা রাশিয়ার সহযোগিতায় পৌঁছে যাবো আকাশের বিপুল উচ্চতায়। আমেরিকা রাশিয়া জাপানের কাতারে নাম উঠে যাবে সবুজ ব-দ্বীপের। অথচ আমাদের মস্তিষ্ক পড়ে থাকবে ১৪শ’ বছর আগে। আমরা আমাদের নারীদের শস্যক্ষেত্র বানাবো। চাষাবাদ চলবে যেমন খুশি তেমন। চাষবাসে হেরফের হলে ‘নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর’ কিংবা ‘জয় বাংলা’ বলে দোররা মেরে তুলে নোবো পাছার চামড়া।

এ তো গেলো বিবি-বিধানের ব্যবস্থা! বড় সাফল্য হলো, ‘শতভাগ মুসলমানের দেশ’-এ কিভাবে পরিণত হওয়া যায় তা আমরা নিশ্চিত করবো। আশি ভাগ মুসলমানের বাইরে আর যেসব বিধর্মী আছে তাদেরকে কতল করা হবে যত্রতত্র। বাকিরা ভয়ে দেশান্তরী হবে। বাংলাদেশ হবে এক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ কওমী জনপদ। জয় বাংলা স্লোগান হয়তো বিলুপ্ত হবে না। তবে আরবীতে অনুবাদ হয়ে যাবে। এমনটাও প্রচার হতে পারে, কেবল স্বপ্নের সোনার বাংলাই নয় বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত স্বপ্ন ছিল ‘মদিনা সনদ’।

যতোদূর দৃষ্টি যায় এমন দীর্ঘ সবুজ ধানক্ষেত চিরে মেঠোপথে বহুদূর হেঁটে আমরা ক’জন ক্যামেরা হাতে পৌঁছে গেলাম নোয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে। চারদিকে কোমল মসৃণ ধানক্ষেত, তার মাঝে প্রায় একাকী দাঁড়িয়ে থাকা শনপাতা বা খড়ের তৈরি একটি দোচালা ঘর। সরু মেঠোপথ লাগোয়া উঠোনে দাঁড়িয়ে বাড়ির কর্তা আঞ্চলিকভাষায় কিছু জানতে চাইছিলেন। তার সঙ্গে দু-চার কথার যাত্রা বিরতি।

চাপকলের ঠাণ্ডা পানি আর ফলবতী বরইগাছে একটা ঝাঁকি দেয়া যাবে কিনা তার অনুমতি চাওয়া হলো। পানির ব্যবস্থা হলো। তবে কর্তা ঝাঁকিতে রাজি হলেন না। আড়াল থেকে তার স্ত্রী বের হয়ে এসে বললো, এক ঝাঁকি একশ’ টাকা। একশ’ টাকার ঝাঁকিতে আমারা রাজি হয়ে গেলাম, তবে ঝাঁকি জোরে হবে নাকি আস্তে হবে তা নিয়ে দফারফা শেষ হলো না। শেষতক, ঘরে কিছু বরই ছিল, সেখান থেকে আমাদের হাতে কয়েকটি তুলে দিয়ে দায় সারলেন। এই ফাঁকে তার ঘরের খোলা দরজায় চোখ আটকে গেলো। কি অদ্ভুত কাণ্ড! ঘরে কোনো আসবাবপত্র নেই, কোনরকম হাঁড়ি-চুলো। অথচ সোনালী ফ্রেমে বাঁধাই করা বেশ বড়সড়ো একটি ছবি ঝুলে আছে প্রধানমন্ত্রীর (তৎকালীন)। আমাদের কৌতূহল বাড়তে থাকলো। ক্যামেরা রোল-ইন করা হলো। বৃদ্ধ উৎসাহ বোধ করলেন।

রাজনীতি তার পছন্দ না। তিনি কোনো দলকেই সমর্থন করতে চান না। আওয়ামী লীগ-বিএনপি কারো প্রতি তার আস্থা নেই, বলার চেষ্টা করলেন। তবে মন্দের ভালো এই যে, ছবির নেত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, তাঁরজন্য এখনও পাঁচ বেলা আজানটা শুনতে পান। হাসিনা রাজা হলে সেই সুযোগটাও থাকবে না। তাকে পাল্টা প্রশ্ন করা হলো, হাসিনা তো আগেও একবার রাজা ছিলেন তখন কি আজান শোনা যেতো না? বৃদ্ধের উৎসাহে ভাটা পড়লো। তিনি উত্তর খুঁজতে সময় নিলেন। কয়েক মুহূর্ত পার করে নীরস মুখে ফ্রেম আউট হয়ে গেলেন।

গ্রামের পথে-প্রান্তরে হাসিনা ঠেকানোর নানান প্রস্তুতি চোখে পড়ছে। চা-দোকান থেকে শুরু করে মহাজনের চালের আড়তের টিন কিংবা কাঠের বেড়ায় শোভা পাচ্ছে শেখ হাসিনার সঙ্গে পরপুরুষের হ্যান্ডশেকসহ কপালে-সিঁথিতে সিঁদুর দেয়া ছবি-পোস্টার। ইসলাম বাঁচাও, হাসিনা ঠেকাও। একটাই স্লোগান।

৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামের অধিবাসী। গ্রামের পর গ্রাম, মাইলের পর মাইল এই যখন মানুষের ধর্মীয় বিবেচনা। সেখানে সেক্যুলার চিন্তাধারার সমাজ বা রাজনীতির কথা যারা ভাবেন তাঁদেরকে সেই তীরহারা ঢেউয়ের উত্তাল সাগর পাড়ি দেয়ার পরিস্থিতি সামাল দিয়েই চলতে হয় প্রতিনিয়ত। একজন শেখ হাসিনা কতোটা অসহায়ত্ব থেকে ঘোষণা দেন মদিনা সনদের তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই বাস্তবতার উজানে চলতে কেবল মৌলবাদের বিষাক্ত ছোবলই নয়, একই সঙ্গে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় মধ্য-উদার-ঘোর ডান, অতি বাম>বামাতীদেরকেও। শান্তিজয়ী ইউনুস, ফরহাদ মাজহার, আনু মুহাম্মদ, সাকিদের মতো ইন্টেকচুয়্যালদের পথে পথে ছড়িয়ে দেয়া কাঁটাও সরাতে হয় তাঁকে।

কাঁটা সরিয়ে পথকে চলাচলের উপযোগী করা যায় বটে কিন্তু বিপজ্জনক হলো, মৌলবাদের বিষবৃক্ষটি। তা কোনভাবে উপড়ে ফেলা সহজ না মোটেই। সে তার বিষাক্ত ডালপালার বিস্তার ঘটাতেই থাকে। শেখ হাসিনা হয়তো আপাত সমাধানের পথ খুঁজছেন। হয়তো তিনি ও তাঁর সরকার এতে সাময়িক মুনাফা ঘরে তুলে নিতে সক্ষম হবেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ফলাফল কেবল শূন্য হয়েই ক্ষান্ত হবে না। তাঁর বা তাঁর অবর্তমানে পরের প্রজন্মকে দিতে হবে চূড়ান্ত খেসারৎ। তিনি শান্তির (ইসলাম!) সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চাইছেন দেশব্যপী। উপজেলা ভরে তুলবেন মসজিদে। রেলবিভাগের ১শ’ একর সম্পত্তির উপর হেফাজত গড়ে তুলবে সুবিশাল দূর্গ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে আছে এমন হাজারও দূর্গ। কেবল কওমী দূর্গই নয়, আছে সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রাচীনগ্রন্থবাদীর দল। তারা আজকাল বিজ্ঞানের শক্তিতেই বেশি বলীয়ান। আর এসব দুর্গ থেকেই টগবগিয়ে ছুটে বের হবে পালে পালে অজস্র বখতিয়ার। তাদের হাতে ছুরি-তলোয়ারের পাশাপাশি শোভা পাবে সর্বাধুনিক দূরনিয়ন্ত্রিত লেজার গান, ড্রোন।

‘একটি ভঙ্গুর ও অপ্রস্তুত জাতিকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিয়ে গেছেন’। বাঙালির ভগ্নদশার বহু করুণচিত্র এমনকি চর্যাপদের বর্ণনাতেও উঠে এসেছে জোরালোভাবে। এ ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো তাতে সন্দেহ নাই। তার আরও একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ দেখা যায় ১২ শতকের শুরুতে। ঘোড়সওয়ারী বখতিয়ার যখন তলোয়ার উঁচিয়ে পূর্বদিগন্তে ছুটে এলেন সেনরাজ উপায়ন্তর না খুঁজে জান বাঁচাতে পেছনের দরজাকেই বেছে নিয়েছিলেন।

তারও আগে ভাগ্যান্বষণে ফেরারী বখতিয়ার আকস্মিক অগ্নিসংযোগ করে ভস্মিভুত করেছিলো নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। অগ্নিসংযোগের ইতিহাস অবশ্য তাদের মজ্জাগত। অপ্রতিরোধ্য বখতিয়ার ধরাশায়ী হলো তিব্বতীদের হাতে। তবে তাঁর আগে এই জনপদে রোপিত হয়ে গেলো আরবীয় মরুক্যাকটাসের বীজ। যে ক্যাকটাস সারা পৃথিবীজুড়ে আজও যৎকিণ্চিৎ ছায়া আর বিপুল কাঁটার সমন্বয়ে ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে নিরন্তর।

বাঙালির সাড়ে চার হাজার বছরের ইতিহাসে যদি সবচে গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়টি হয় ১৯৭১, তবে অবধারিতভাবে সবচে শোচনীয় ও গ্লানিময় অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১২০৫ সালে। পশ্চিমা আরব্য মরুদর্শনের সেই ক্ষত সবুজ-শ্যামল নদীমাতৃক এই অববাহিকা আজও বহন করে চলেছে অনিবার্যভাবে। আজও সেই দর্শনধারীদের একটি অতি উগ্রবাদী ক্ষমতালোভী দলের ছুরি-তলোয়ারের নিচে অকাতরে বয়ে চলেছে বাঙালির রক্তের ধারা।

শেখ হাসিনার পারিবারিক পরিচিতিমূলক সূত্রে দাবি করা হয়েছে, তাঁর পূর্বপুরুষগণ আরব্য মরু অঞ্চল থেকে আগত। সভা সেমিনারে যখন শেখ হাসিনার পারিবারিক ঐতিহ্য সম্পর্কে বলা হয় তখন অনেকের চোখ নিশ্চয় চক চক করে ওঠে, অনেকে বিগলিত বোধ করেন। যেন বাংলার মূল ভূখণ্ডের বাইরে থেকে যারা আগত তারা অতি মানব। আর বাঙালি মাত্রই ঊনমানুষ, অর্ধমানুষ। বস্তুত এটাই বাঙালির প্রধানতম হীনমন্যসুলভ মনোবিকলন। শাহ পরান, শাহ জালাল, শাহ আলী, খান জাহানদের অলি আউলিয়া দরবেশ করে তুলেছে এই হীনমন্য বাঙালি। মূলত এদেশে তাঁদের আগমন ঘটেছিল ব্যবসায়িক ধান্দায়। কিন্তু বাঙালির সুপ্রাচীন ইতিহাস হলো, কোন ভিনদেশী দেখা মাত্র বিগলিত বোধ করা। এর কারণ সম্ভবত প্রকৃতিনির্ভর ও দুর্যোগকবলিত জীবনকে কোন ম্যাজিকরিয়েলিজমের হাতে সপে দিয়ে পরিত্রাণ খোঁজা। এ থেকে বাঙালির আজও মুক্তি মেলে নি। এখনও বাংলাদেশের রাস্তায় যে কেউ একজন বিদেশী বিশেষ করে ইউরোপ,আমেরিকা বা অষ্ট্রেলিয়ান কোন নাগরিক দেখা গেলে চারপাশের লোকজন অতি উৎসুক হয়ে ওঠেন, সমীহ করেন। কেউ কেউ হয়ে ওঠেন বিশেষ অতিথি পরায়ণও। অতিথি পরায়ণ নেতিবাচক না মোটেই। কিন্তু আমরা আমাদের মূল্যেবোধকে বিসর্জন দিয়ে যুগে যুগে গত কয়েকশ’ বছর ধরেই ভিনদেশীদের ছায়াতলেই হয়েছি ভাগ্যান্বেষী। জাতি হিসেবে বাঙালি কতো শোচনীয় যে, আজও আমরা আমাদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে অবগত হতে পারি নি।

যদি তাই হয় তবে তিনিতো সেই ১৪শ’ বছরের পুরোনো মরুদর্শনের প্রতি আনুগত্য রাখতেই পারেন। এটা তাঁর সহজাত অর্থাৎ তিনি জিনগতভাবেই বহন করে চলেছেন ঐ মরুদেশীয় উত্তরাধীকার। তবে কি এ মাটি আজও কোননা কোনোভাবে উপনিবেশবাদের মাঝেই বন্দি হয়ে আছে? মহারাজ ঈশা খাঁ ছিলেন আফগান বালক। বালক তার নানার হাত ধরে বাংলায় এসেছিলেন এবং এ দেশের নদী-জল-হাওয়ায় মুগ্ধ বালক আর ফিরে যান নি স্বদেশে।

২০০৪ সাল তখন। উপসাগরীয় অঞ্চল মার্কিন আগ্রাসনে দ্বিতীয় দফায় প্রকম্পিত। কবি নির্মলেন্দু গুণ একটি কবিতা লিখেছিলেন সে প্রেক্ষাপটে। শুরুটা ছিল এমন― ‘আমেরিকা আমরা ভেবেছিলাম সোভিয়েতবিহীন বিশ্বে তুমি আরও বেশি দায়িত্বশীল হবে’! বাগদাদজুড়ে হাহাকার। হাসপাতাল বা জাদুঘরও রেহাই নেই। ভয়াল আর্তনাদে আছড়ে পড়ছে দূরপাল্লার মিসাইল। না আমেরিকা দায়িত্মশীল হয় নি। বরং একক আধিপত্য নিয়ে তার জটিল-কুটিল অগ্নিমূর্তিই দেখা গেছে বিশ্বব্যাপী। ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ প্রেম কাতর কবির আর কীইবা করার আছে, আক্ষেপ আর অন্তর্যাতনা ছাড়া!

আমাদের দেশের রাজনীতিকরা অসহিষ্ণু, ক্ষেত্রবিশেষ অনেকেই অসৎ এবং কেউ কেউ অশিক্ষিতও বটে। এমন কথা যত্রতত্রই শোনা যায়। এসব প্রসঙ্গ এখন ব্রাত্যজনের ভাবনায়ও জায়গা করে নিয়েছে। ঢালাওভাবে অবশ্য বলা সমীচিন না যদিও, কেননা সৎ এবং মহৎ ভাবানার মানুষ ছাড়া কোনো সমাজ বা জাতির টিকে থাকা তো সম্ভব না।


যুদ্ধাপরাধের বিচারিক কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা। এ কথা সত্য যে, প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার একটি যেনতেন ধরনের রায়ই চেয়েছিল। দুই বিচারপতির টুইটার কথোপকথনে এমনটাই বের হয়ে আসে। এর সত্যতাও প্রমাণ হয়, প্রথম রায়টি প্রকাশের পর। ঐ সন্ধ্যা থেকে গণজাগরণ মঞ্চ’র তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার পুনরায় রায় প্রদান ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শেখ হাসিনার দৃঢ় ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব এক অনন্য উচ্চতাকে স্পর্শ করতে যাচ্ছে কিংবা অনেকাংশে করতে সক্ষমও হয়েছে। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচার (চূড়ান্ত শাস্তির রায়) বাস্তবায়নের অন্তত অর্ধেক কৃতিত্ব অবশ্যই গণজাগরণমঞ্চ’র এ কথা স্বীকার করতেই হবে।


বহুমাত্রিক সাফল্যের অন্ধকার দিকটিও আছে। আওয়ামী লীগ কি একক আধিপত্যের যুগে প্রবেশ করেছে? তারা হয়ে উঠছে একক প্রতাপশালী? যদিও আওয়ামী লীগকে টিকে থাকতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত ছায়াযুদ্ধকে মোকাবিলা করে। সজীব ওয়াজেদ জয় এর ব্যক্তিগত-পারিবারিক সততা শিক্ষা ও উন্নয়নভাবনা নিয়ে সংশয় নেই। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘শক্তিমান’ হয়ে ওঠার বিরূপ প্রভাব ইতিমধ্যে তাঁকে কিছুটা হলেও ভারাক্রান্ত করে তুলছে অনুমান করা যায়। আমরা আর কোনো তরুণ নেতৃত্বকে চৌর্যবৃত্তি স্মাগলারি কিংবা খুনের পরিকল্পনাকারীরূপে নির্বাসিত দেখতে চাই না। একজন সুশিক্ষিত বিজ্ঞানমনস্ক মানবিক মানুষের হাতে বর্তাবে লাল-সবুজ পতাকাটির রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব, এমনটাই প্রত্যাশা। কবি নির্মলেন্দু গুণ আমেরিকার একক আধিপত্যের হাতাশা কাটিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে খুলবেন তাঁর আশাবাদী কবিতার খাতা। বিল-ঝিলে লাল টকটকে পদ্মফুলে ভোরের প্রথম সূর্যের বিকিরণের মতো তরুণ-তরুণীরা সাজাবে আগামীর স্বপ্ন। খুন, ধর্ষণ আর মৌলবাদ শব্দগুলো বন্দি থাকবে কেবল অভিধানের পাতায়।

তবে নিকট বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এক অনিশ্চিত অবক্ষয়ের গ্রহণকাল অতিক্রম করছে। অবশ্য এ কালাতিক্রম বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কিছু না হলেও ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছে নানান প্রেক্ষাপটে। এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও পেট্রোল ঢেলে মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ঘৃণিত নজির দেখিয়েছেন আমাদের রাজনীতিকরা। মুক্ত বা ভিন্ন চিন্তার মানুষদের একের পর এক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে আমাদের নির্লজ্জ পৈশাচিক রূপটিই প্রকাশিত হচ্ছে বারবার। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় মদিনা সনদ নয়। প্রয়োজন, বিজ্ঞান ও মানবিক সংস্কৃতির চর্চা। এ ঘোর অন্ধকারে ঐ একটিই প্রদিপ শিখা। প্রবল খরদাহে ঐ একটিই ছায়াদানকারী বৃক্ষ। ঘাস লতাপাতার এই দেশে বৃক্ষটিকে আমাদের খুব প্রয়োজন। বৃক্ষটির নাম শেখ হাসিনা। অকূল অন্ধকারে শেখ হাসিনাকে জয়ী হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ন্তর নাই। সকল কাঁটা ধন্য করে তবু এ হাসি থাকুক অটুট অমলিন।


মুক্ত মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। shompadak.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে shompadak.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: