শিশির আজম-এর দীর্ঘ কবিতা

192
bdtruenews24.com

যেভাবে মানুষ মানানসই পৃথিবী পেতে পারে


কেন তোমার কাছে আসি
কেন দিনগুলো রাতের মতো নয়

গাছ যখন ঘুমোয় এমন কি তখনও গাছ জেগে থাকে যাতে স্মৃতিদের অভিযাত্রায়
নিশ্চিৎ হয় তার সত্তাধিকার
নক্ষত্রেরা শেয়ালের মতো রাস্তা শুঁকে বেড়ায়
তারা যেন ট্রাফিক পুলিশ তাদের চোখের শীত পিচ্ছিল আলোয় জড়ানো
আমি দেয়াল ঘেষে হাঁটি
আর প্রতিটা দেয়াল সামনের রাস্তাগুলোর নাম লিখে রাখে
বিশাল নীল রঙের রাস্তায়
আমার জন্য অপেক্ষা করছে নীল রঙের সিংহ
গভীর সবুজ রেণুতে ডুবে আছে রাস্তার পাশের গাছগুলো
ভেবেছিলাম খবরের কাগজগুলোকে আমি দক্ষিণের বাতাসে স্বেচ্ছায় উড়ে যেতে দেবো
ওগুলো যাচ্ছেতাই
সকাল হয়ে আসে আর কাকগুলোও চেঁচাতে থাকে
ছিল এক জলধারা
গাছের শক্ত গুড়ির ভিতর
মসৃণ আলোকসজ্জাতে যা ছিন্নভিন্ন হয়েছে
ভোঁদড়গুলোকে নিয়ে খেলতে যেয়ো না ওগুলো কুমির
আকাশের তারারা সারাদিন ছুটিতে ছিল হয়তো কিছু মুখেও দেয়নি
আর এখন দেখ একেকজন বিয়ের কন্যে

কোন পার্থক্য নেই
জানলার আকাশ
আর
তোমার নীল কামিজ

তোমার ঐ নিচু মুখখানা তোল অনুভব কর আস্ত একটা গ্রহের
নিজেকে বিষ্ফোরিত করার আনুষ্ঠানিকতা
কুয়াশা নেমে এলে ভেসে উঠবে সাগরের শত শত পাল
সারারাত এক ফোঁটা না ঘুমিয়ে
মরার জন্য নিশিপদ্ম বেঁচে রয়েছে কি নিরঙ্কুশভাবে
রাস্তার ফুলের বাজপাখি আকাশকে নিচে টেনে আনছে
মানুষ এখনও বনেই আছে তুমি ভাবো আর তার নিরাপত্তাই বা কি
জরুরি কাজগুলোকে কোনভাবেই ঝেটিয়ে বিদেয় করা যাচ্ছে না
ছোট্ট সকালে শালিখের প্রকাণ্ড জীবন চারপাশে ঘুরছে
একটা বিন্দু একটা রেখার মা
দুজনেই অজ্ঞাত গহ্বরের দিকে
আমাদের টেনে নিয়ে যাবে
শেয়াল অপেক্ষা করছে এটা বোঝার জন্য যে বন রচনার ঠিক কোনখানে
তার অবস্থান
আর শুদ্ধ এক চোর
পুরনো বছরগুলোকে নেড়ে দেখছে জড়ানো কাঁথায়
তোমার গলার স্বর ছোট ছোট মাছের কোলাহল হ্রদের ভিতর
বাইরে মাছির জগৎ
দুটো অণু যেন জোড়া লাগানো কিন্তু তারা আলাদা
অসামান্য জীবনের কথা কল্পনা করে কৌতুক অনুভব করছে

ড্রোনগুলো উশখুশ করছিল
এখন মর্মাহত তেহরানের আকাশে যদি আর ওড়া না হয়

আমরা এক বিছানায় থাকি
বিছানা একটি
মানুষ দুজন

শূন্য জায়গাটাতে আমি চেয়েছিলাম চারাগাছের মতো জড়িয়ে ধরতে
সেখানে এখন তুমি
যদিও জানি তুমি নিছক একটি রাত্রি আর আমি বাদুরের মতো ঝুলে আছি
খরগোশ লাফিয়ে ওঠে তার ছায়া থেকে
তিন মিনিট আগে
সে ছিল এক্রোপলিসে
মুণ্ডুহীন পৃথিবীর ধারালো ফলকে
খড়ের পাখি
পাখির গান
খরগোশ নিজেকে বিলুপ্ত করে কিছু একটা হতে চায়

হঠাৎ বৃষ্টি হলে আমার হাসি পায় কেন
আমি কিন্তু গোঁফের নিচে বিড়ালের হাসিও দেখতে পায়
তাই বলে আমাকে বিড়াল ভাববেন না
আমি কিছুটা বিড়াল কিছুটা কবরখানার দারোয়ান
এখন আমি হাঁটছি ধানক্ষেতের আল ধরে
শীষগুলো কয়েকদিনের মধ্যেই পেকে যাবে
তখন আর ওদের আদর করতে পারবো না
নাগালের বাইরে চলে যাবে
আমি তবু ভুল রাস্তায় যাবার জন্য ভুল নির্দেশকচিহ্ন খুঁজতে থাকি
যাতে সেই ধানকণাটির দেখা পায়
যে একটা পায়রার ঠোঁট থেকে পড়ে গিয়ে জড়িয়ে রয়েছে কোন এক বাতাসের সুতোয়

ঝড়ের সঙ্গে শিশুর চোখের সঙ্গে মিশে যেতে পারাটা বেশ জটিল ব্যাপার
আমারও শিশুর মতো বিস্ময়
কাঁপা কাঁপা হাত
সহজ ভাষা
ভোঁদড়টা সারা রাত ছিল নৌকায় এখন চুলোর ধারে ঘুমোচ্ছে
এইমাত্র যিনি মারা গেলেন তিনি ছিলেন খুবই সাধারণ
তবে তার আত্মা অসাধারণ
তার আত্মাপরমাণু ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র
ঘিরে ধরেছে আমাদের
তা আমার আত্মার গঠনপ্রক্রিয়ার অংশ হতে যাচ্ছে

তাহলে আগ্নেয়গিরি কোথায় পূর্বপুরুষেরা তো সেখানেই বেঁচে ছিলেন
যদি তাদের জীবীত ধরি
তাহলে তো আমাদের আরও সাহসী হবার দরকার পড়ে
মাতৃভাষার অভিঘাত না এড়ানো

হাজার বছর ধরে আমি ছিলাম বইয়ের ভিতর নিরাপদ শব্দধারায়
তারপর ঘূণপোকা
প্রতিবেশীরা ভাল আর বন্ধুত্বের জাল আর মাকড়শার হাত থেকে নিস্তার নেই

প্রথমত বাঁচা দরকার
আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরি
মরতেও মন্দ লাগবে না
জানলায় ডালিম ফুলের হাওয়া
তোমার নিঃশ্বাস আমার প্রতি বিশ্বস্ত
সেতুর নিচে জল কাঁপছে জলের উপর বাড়ি

প্রতিটা মানুষ একেকটা দ্বীপে বাস করে আমি চেয়েছিলাম আজানা ঐ দ্বীপগুলোকে
একটি রেখায় জড়িয়ে নিতে
যে রেখা বনতিতিরের পালকে আঁকা

আমার একদমই অপছন্দ এসময় দেবদূতের অভিবাদন
দেয়ালের টিকটিকি অমর
ঐ স্বাস্থ্যবতী গাভীগুলোকেই যা একটু সহ্য করা যায়
ক্যালেন্ডারের সবুজ পাতা থেকে
যারা এখন ধীর পায়ে নেমে আসছে

পৃথিবীতে ভ্রান্তি নেই
বিন্দু আছে যা হয়তো এলোমেলো যা একটি মালা যা একটি জীবন

কাঠগুলো পড়ে যাচ্ছিল
ওগুলোকে উঠোনে শুকিয়ে উঠোনেই জড়ো করে একটা ধূনি জ্বেলে দাও
দেখি কাকপক্ষী আর তারাদের ভিতর কাদের কাদের মরার এতো সাধ

জন্তুদের মেরে ফেলার পর তাদের চামড়া বিক্রি করে দেয়া হয়
আর ফুলগুলোকে বানানো হয় মালা
আমরা যারা জলের তলায় ছিলাম ভালই ছিলাম
গরু বিষয়ক রচনা লেখার দরকার হয়নি

সন্ধ্যা হয় হয় বাচ্চারা পড়তে বসবে
আমি কিন্তু আমার চোখদুটোকে শেয়ালের গর্তে রেখে এসেছি
ওরা সব জানে
কেন আমি তোমাদের চক্ষুশুল হতে যাব

গতকাল উঠেছিলাম এক লক্কড়ঝক্কড়মার্কা বাসে
সেটাও এখন ঐ শেয়ালের গর্তে প্রজাপতির মতো কাঁপছে
যারা বাচ্চাদের সঙ্গে প্রজাপতি-খেলা খেলছে
আমি বলছি শেয়াল-খেলা সম্মন্ধে তোমাদের কোন ধারণাই নেই

বাড়ি ফিরে দেয়ালে পেনসিলের দাগ টানলাম নিশ্চলতায়
শেষবারের মতো এক মহাপুরুষকে খুন করেছি
সে ছিল মাকড়শার জালে
আমিও মাকড়শার জালে

এই তো নিশ্চলতাকে অবহেলা এটা কোথা থেকে এলো
গান্ধীর জাঙ্গিয়া কে কেচে দেয়
আমরা তো সাঁতারকাটা মাছ
আঁশ আছে আঁশ দেখা যায় না
গভীরতা আর উচ্চতা অন্যদের হাতে

আমি তোমাকে চিনি এটা হল অর্ধসত্য আর এই অর্ধসত্যই উৎসাহ দেয়
বিপদে নিমজ্জিত হতে
তোমার ঠোঁট এক মারাত্মক ছুরি
পুরানেও উল্লেখ আছে

একটি শ্বাস একটি মহাকালের ধারক যা ঠিক বিচার্যের নয়
অনুভবের
একজন রোগী জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বস্তুত ওটা জানালা নয়
আর সে রোগীও নয়

আমি অবশ্য ভালবাসি রাস্তার জলধারাকে
আর জলের ঝাঁকড়া চুলের আমগাছটাকে
রাস্তার কুকুরটাকেও
যে কুকুর কোন কিছুই মান্য করে না
নিজেকেও না

পোষা পায়রা জোড়াকে এখন আমি ছেড়ে দেবো কিন্তু তারা তো এই পরিচিত আকাশকে
অতিক্রম করতে পারবে না
টহল শেষ করে মোড়ের রাস্তা থেকে পুলিশ ভ্যান চলে গেলে
আমার মাথার ভিতর কুয়াশারা
জায়গা বদলে নেয়
আর কি আশ্চর্য ব্যাপার কোন কিছু যদি মরেও যায় তা বেঁচে থাকে
জলজ্যান্ত স্মৃতি হয়ে
আর আমাদের মুখ ভ্যাংচায়
তাহলে মরে যাবার কি দরকার ছিল
এভাবে রাত বারোটার ট্রেন চলে যায় নরম মাটি আর পাখিদের হাড়গোড়ের
ওপর দিয়ে

সকাল সকাল বুড়ি দুধ দিয়ে গেল
বুড়িটা এক খচ্চর
মাথার শনের ঐ এক গোছা চুল দিয়ে
তাড়িয়ে বেড়ায় শয়তান

অবসন্ন স্বপ্নের নিচে আমরা তলিয়ে যেতে পারি
তাহলে সেই গরুগুলো কোথায় যাদের গলায় কোন দড়ি পাওয়া যায়নি
আর সেই প্রভুহীন কুকুরগুলো

সে যদি কারো জন্য অপেক্ষা করে থাকে তবে তা নিজেরই জন্য
তার নিজের একটা বাড়িও আছে

প্রকৃতির ভিতর সে দাঁড়িয়ে আছে যা রাতের মতো স্বচ্ছ
প্রজাপতির মতো
আর রাতের ধমনীতে প্রবাহিত ট্রেনের মতো

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা বেশ কঠিন
সে নিজেকে দৃঢ় করে তোলে আর যানবাহনগুলোর জন্য ক্রমাগত উদার হয়
ওটা একটা খাঁদ
ওরা যাই বলুক যতই ভেতরে ঠেলে দিক
তুমি যদি নিজের ভেতর ঘুরপাক খাও আর নিজেকে আবিষ্কার কর
তাহলে রাস্তাকে দোষারোপ করে লাভ কি

রাস্তা বেঁচে থাকে আমাদের কুয়াশায়
তার আর কিছুই চাওয়ার নেই

মানুষ আর জন্তুজানোয়ারের শ্বাসে পৃথিবী ভরে আছে
গাছেরা সব দেখে
একটাই চাঁদ অনেকগুলো আকাশ
মানুষ বাগান তৈরি করে আর এমন সাজানো বাগান দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়
গাছ কোথায়

মরা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিন্তু সমুদ্র তো সাধারণ ও তুচ্ছতাকে অবজ্ঞা করতে সক্ষম
কেন যে কাউকে ঘৃণা করতে পারছিনে
আমাকে যারা ভালবাসেন
তাদেরকে না
যাদের মাথা বলতে কিছু নেই
অথবা যা আছে তা কাদার নিচে
তাদেরকেও না

সমস্ত ক্যামেরা তাক করা রয়েছে মাইক্রোফোন কারো বন্ধু নয়
কেন তোমার কাছে আসি কেন উপসাগরের দিকে আমি ঝুঁকে পড়েছি
সমস্তই সচেতনভাবে এগোয় এটা ভাবা বোকামী
আস্ত দেয়াল খেয়ে ফেলা যাবে না ভেঙে ফেলা যাবে
ভাঙাচুরো ইটের ঢিবির ভিতর ফাঁকে ফাঁকে
কুচি কুচি ছত্রাক
শান্ত সাপের আকাক্সক্ষা
এখন একটা বোমা ফাটুক তাহলে গ্রামবাসীদের মতো আমিও বেরোবো
সেদিন আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম অরণ্যের ভিতর যা ফুল ফোটায়
আর বমি উগরে দেয় ব্যস্ত রাস্তার মতোই
ঘুঘুপাখিটি যেন আমাকেই ডাকছে
বৃষ্টি শুরু হলো
দেখ ব্যাঙ আর পোকামাকড় ঘন্টাধ্বনি ছাড়াই হাজির
তুচ্ছতাও মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে
মেয়েটা উদ্ধত মাস্টারমশাই তাকে আঁকতে দিয়েছেন বৃত্ত আর বৃত্তটাকে
শেষ পর্যন্ত সে জোড়া লাগায়নি
কেননা সে আটকা পড়ে যাচ্ছিল

কারা যেন সন্ধ্যার বস্তুগুলোকে এড়িয়ে গিয়েছে অখ্যাত বলে
তারা দৈত্যের মতো ধেয়ে আসছে ডাইনিং টেবিলের দিকে
কোথায় জঙ্গল আছে
কারা চেনে জঙ্গলের সুড়ঙ্গপথ আর বনমহিষের সরোবর

বাতাসের ঘর্ষণে
আমার কান বন্ধ হয়ে আসে
সেই কান এখন নিচু
তোমার বুকের কাছে

জগতের সব অশুদ্ধ প্রাণী শেষ পর্যন্ত বিশ্রাম নেয় গাছের নিচেই
গাছের শরীরেও তো প্রাণীর রক্ত
তোমার সুযোগ নেই নিজের দিকে তাকানোর
আমার ভিতরে তুমি মিশে যাচ্ছ
এই দ্রবণ
বিক্রিয়া
পৃথিবীকে পথে আনতে

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: