রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির জড়িতদের নাম জানতে চান ফিলিপাইনের আদালত

31
রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির জড়িতদের নাম জানতে চান ফিলিপাইনের আদালত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের দেওয়া মামলায় ফিলিপাইনের আদালতে গতকাল বৃহস্পতিবার সাক্ষ্য দিয়েছেন বাংলাদেশের দুই কর্মকর্তা- বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাহিম। এই প্রথম ফিলিপাইনের আদালতে তদন্ত-সংশ্নিষ্ট বাংলাদেশের কোনো কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিলেন।

ফিলিপাইনের আদালত এ সময় বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের কাছে হ্যাকিং এবং এ ঘটনায় জড়িতদের নাম জানতে চেয়েছেন। সেখানকার আদালতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা সম্পর্কিত একটি মধ্যবর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। একাধিক উচ্চপদস্থ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ফিলিপাইনের আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার তদন্ত কার্যক্রমে বড় ধরনের গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানাচ্ছেন, রিজার্ভের অর্থ চুরি একটি ট্রান্স-ন্যাশনাল অপরাধ। তাই দেশ-বিদেশের সব সংস্থার তদন্ত কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, দেশের আদালতের অনুমতি নিয়ে দুই কর্মকর্তা ফিলিপাইনের আদালতে সাক্ষ্য দিতে গেছেন। যে মামলায় তারা সাক্ষী দিয়েছেন সেটির অন্যতম আসামি হলেন সেখানকার ব্যাংক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) কর্মকর্তা মায়া দিগুতি।

সূত্র জানাচ্ছে, ফিলিপাইনের আদালত প্রথমে বাংলাদেশি তদন্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার ইচ্ছে জানায়। পরে তারা অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত জানতে চায়। বিষয়টি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) জানানো হয়। তারা সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ করার পর দুই কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিতে ফিলিপাইনে যান।

২০১৬ সালে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে চারটি ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় দেশ-বিদেশে তোলপাড় শুরু হয়। একই বছরের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক যুবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করেন। মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।

ইতিমধ্যে রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িতদের অনেকের নামও শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- জাপানের সাসাকিম তাকাশি, জয়দেবা, আরসিবিসির জুপিটার শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো, এনজেলা তেরেস, মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগোরাস, আলফ্রেড ভারগারা, এনরিকো তায়েদ্রো ভাসকুয়েজ, কিম ওং, স্লুইড বাতিস্তা, ফিলিপাইনের ব্যবসায়ী উইলিয়াস গো সো, শ্রীলংকার এনজিও শালিকা ফাউন্ডেশনের গামাজ শালিকা পেরেরা, সানজেবা টিসা বান্দরা, শিরানি ধাম্মিকা ফার্নান্দো, ডন প্রসাদ রোহিতা, নিশান্থা নালাকা, ওয়ালাকুরুয়ারাচ্চি প্রমুখ। ফিলিপাইনের আদালত অভিযুক্তদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্ত-সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে তদন্তে অভিযুক্ত হিসেবে তাদের নাম এসেছে।

এরই মধ্যে শালিকা ফাউন্ডেশন ও আরসিবিসি ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল ও এফবিআই পৃথকভাবে এ ঘটনার তদন্ত করছে। সূত্র জানায়, চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি করা হয়। গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে- হ্যাকার, মানিলন্ডার, নেগোসিয়েটর ও ইনসাইডার। সিআইডি বলছে, বাংলাদেশের ভেতর থেকে যারা পরিকল্পিতভাবে অথবা গাফিলতির মধ্য দিয়ে হ্যাকারদের সহজে সার্ভারে প্রবেশ করার সুযোগ করে দিয়েছেন তারা ইনসাইডার। এরই মধ্যে সিআইডির তিনটি গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। যাদের ‘গাফিলতির কারণে’ হ্যাকাররা অর্থ চুরির সুযোগ পেয়েছে সিআইডি তাদের সম্পর্কে জানতে পেরেছে। তবে আর্থিকভাবে তারা কী ধরনের সুবিধা পেয়েছেন, তা এখনও জানা যায়নি। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় তারা চার্জশিটে আসামি হতে পারেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্নিষ্টদের ভূমিকাকে শুধু ‘গাফিলতি’ বলে তারা মনে করছেন না। এটা ‘ক্রিমিনাল ইনটেনশন’- যা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে জানা গেছে।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ বিদেশি নাগরিকের সন্দেহাতীত সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তারা এ মামলায় আসামি হবেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরসিবিসি ফিলরেম, ইস্টার্ন হাওয়াই লেইসার, লুমবেরিং, সোলারিন ও সালিকা ফাউন্ডেশন অভিযুক্ত হবে। তবে মূল হ্যাকারদের এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কর্মকর্তার আইটি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অদক্ষতা, গাফিলতি ও চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থ চুরির মামলায় তাদের আসামি করার মতো সন্দেহাতীত তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। এ কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ, আইটি, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ ও ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে কাজ করছেন। এমনকি সুফইটের অন্তত তিনজন কর্মকর্তার দায়িত্বে গাফিলতির তথ্য পেয়েছেন তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা। তারাও ফৌজদারি মামলায় আসামি হচ্ছেন।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook