মোহাম্মদ আলির জীবনযুদ্ধের গল্প

143
bdtruenews24.com

মোহাম্মদ আলি। ছিলেন বক্সার। সর্বকালের অন্যতম সেরা বক্সার। তর্কসাপেক্ষে ইতিহাসের সেরা। প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াতেন রিংয়ে। মৌমাছির মতো হুল ফোটাতেন প্রতিপক্ষের শরীরে। তিনবারের বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন বক্সিংকেই নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য এক উচ্চতায়। সেখানে অমরত্ব নিশ্চিত করেছেন। রিংয়ের বাইরেও সমান প্রতিবাদী ছিলেন আলি। সমস্ত অবিচারের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ থাকতো ওপরে। তবে প্রায় ৩২ বছর ভুগেছেন পারকিনসন রোগে। যে রোগ তার প্রাণশক্তি কেড়ে নিয়েছিল অনেকটাই। এই কিংবদন্তি বক্সার ৭৪ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্সের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন শুক্রবার সন্ধ্যায়। যোদ্ধা আলির জীবনের গল্পের কিছুটা তুলে ধরা হলো কালের কণ্ঠের পাঠকদের জন্য।

১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি কেনটাকির লুসভিলে আলির জন্ম। নাম ছিল ক্যাসিয়াস ক্লে। মিডল-ক্লাস পরিবারে বেড়ে ওঠা আলি ১২ বছর বয়সে বক্সিং শুরু করেন। ১৯৬০ রোম অলিম্পিক গেমসে তিনি লাইট হেভিওয়েটে সোনা জেতেন। এরপর পেশাদার হয়ে ওঠেন আলি। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী আলির নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বক্সিংয়ের মতো তার মুখও ছুটতো গুলির মতো। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদী চরিত্র ছিলেন আলি। নিজের অলিম্পিক সোনার পদক নদীতে ছুড়ে ফেলেছিলেন।

১৯৬৩ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন আলি। তবে প্রথম দিকে তা গোপন রেখেছিলেন। এরপর হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন সনি লিস্টনকে হারিয়ে আলি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন। তখন তার দাবি ছিল, “আমি গ্রেটেস্ট! আমি গ্রেটেস্ট! আমি দুনিয়ার রাজা।” ২২ বছরেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

নতুন চ্যাম্পিয়ন তার নাম ক্যাসিয়াস ক্লে বাদ দিয়ে দেন। ঘোষণা দেন, এখন থেকে তিনি মোহাম্মদ আলি। সাফল্যের সাথে ছয়বার শিরোপা ধরে রাখেন আলি। ১৯৬৭ সালে তাকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের জন্য ইউএস আর্মিতে নাম লেখাতে হয়। কিন্তু দুর্বল, দরিদ্র, ক্ষুধার্ত মানুষের বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন। তার বক্সিং টাইটেল কেড়ে নেওয়া হলো। ৫ বছরের জেল হলো। আপিলে মুক্তি পেলেও বক্সিং ও দেশ ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এলো।

আলি বিভিন্ন কলেজে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে লেকচার দিতে শুরু করলেন। কালোদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নামলেন। চার বছর লাগলো আলির নিজের অধিকার ফিরে পেতে। ১৯৭১ সালে সুপ্রিম কোর্ট তার জেলের বিরুদ্ধে রায় দিল।

আবার বক্সিং লাইসেন্স ফিরে পেলেন আলি। কিন্তু মাঝে মূল্যবান সময় হারিয়েছেন। ফিরে জেরি কোয়ারিকে হারালেন। ছয় মাস পর ম্যাডিসন স্কয়ারে জো ফ্রেজিয়ারের কাছে ১৫ রাউন্ডের দ্বৈরথে হেরে গেলেন তিনি। ওই বিখ্যাত লড়াইকে বলা হয় ‘দ্য ফাইট অব দ্য সেঞ্চুরি’।

এই লড়াইয়ে শুরু হয় আলি-ফ্রেজিয়ার ঐতিহাসিক ডুয়েল। ইতিহাস ছাপিয়ে গেছে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৯৭৪ সালে এই দুই বিশ্ব সেরা আবার লড়লেন। ফ্রেজিয়ার হারলেন। জিতে হেভিওয়েট টাইটেল লড়াইয়ের দাবিদার হলেন আলি। পরের বছর জায়ারে জর্জ ফোরম্যানকে হারিয়ে শিরোপা জিতলেন আলি। এই লড়াইকে বলা হয় ‘দ্য রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল’। অষ্টম রাউন্ডে ফোরম্যানকে নক আউট করেন আলি। তার নতুন লড়াই কৌশল দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আলি-ফ্রেজিয়ার ট্রিলোজির তৃতীয় লড়াই হয় ১৯৭৫ সালে। ‘থ্রিলা ইন ম্যানিলা’ নামে পরিচিত তা। সর্বকালের অন্যতম সেরা বক্সিং ম্যাচ বলা হয় সেটিকে। ১৫তম রাউন্ডে টেকনিক্যাল নক আউটে জিতে যান আলি। ১৯৭৮ পর্যন্ত তিনি তার টাইটেল ধরে রাখেন। তরুণ লিওন স্পিংকস তাকে হারিয়ে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিলেন। এরপর দ্রুত সেই শিরোপা ফেরত এনেছিলেন আলি। ১৯৭৯ সালে আলি বক্সিং থেকে অবসর নেন। তখন ৩৭ বছর বয়স তার। কিন্তু ১৯৮০ সালে ফিরে ল্যারি হোমসের সাথে লড়লেন। হারলেন। পরের বছর হারলেন ট্রেভর বারবিকের কাছে। আর লড়েননি। অবসর নিয়েছেন চূড়ান্ত ভাবে।

১৯৮৪ সালে আলির পারকিনসন রোগ ধরা পড়ে। আলি বলেছিলেন, এই রোগ তাকে মানুষের চোখে সুপারম্যান ইমেজ থেকে সাধারণ একজনে নামিয়ে দিয়েছে। তাতে অবশ্য কোনো আক্ষেপ ছিল না তার। যোদ্ধা আলি লড়ে গেছেন জীবনের শেষ পর্যন্ত। অসুখের কারণে লোকচক্ষুর আড়ালেই বেশি থেকেছেন আলি। তবে ইসলাম ধর্ম ও মানবতার জন্য কাজ করে গেছেন। ১৯৮৫ সালে লেবানন ও ১৯৯০ সালে তিনি ইরাকে গেছেন আমেরিকান জিম্মিদের উদ্ধার করতে। ২০০২ সালে আফগানিস্তান সফরে গিয়েছিলেন জাতিসংঘের শান্তিদূত হিসেবে।

১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকের মশাল জ্বালিয়েছিলেন আলি। তার ধীর পদক্ষেপ, কাঁপা কাঁপা শরীর, হাত, দুর্বলতা বিষাদে ঢেকেছিল বিশ্বজুড়ে তার ভক্তদের। ২০০৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তাকে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম দেন। আলির হোমটাউন লুসভিলে মোহাম্মদ আলি সেন্টার চালু হয়।

আলির ব্যক্তি জীবনে তিনটি ডিভোর্স। ৯ সন্তানের বাবা তিনি। এদের একজন লায়লা আলি। আলির শেষ স্ত্রীর সন্তান। লায়লাও বক্সার হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলির স্বাস্থ্য আরো খারাপ হতে থাকে। ২০১৩ সালে একবার মৃত্যুর সাথে লড়ে ফিরেছিলেন। গত বছর একদিন অচেতন পাওয়া যায় তাকে। হাসপাতালে নেওয়ার পর আলি সুস্থ হয়ে আরিজোনার নতুন ঠিকানায় ফেরেন। শেষের দিকে কথাও বলতে পারতেন না। ২০০৯ সালে তার ব্যক্তিগত দর্শনের রচনা স্ত্রীকে পড়ে শুনাতে হয়। আর এবার সবকিছু পেছনে ফেলে চির অজানায় চলে গেলেন একজন যোদ্ধা আলি।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...