মায়া অ্যানজেলোর কবিতা | অনুবাদ: রেজা নুর

149
bdtruenews24.com

[মায়া অ্যানজেলো (Maya Angelou) আমেরিকার সাম্প্রতিক সাহিত্য ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম। জন্ম, ৪ এপ্রিল, ১৯২৮, সেন্ট লুইস, মিজৌরী। বেস্ট সেলিং উপন্যাস: I know Why the Caged Bird Sings, Gather Together in My Name, এবং The Heart of a Woman. কবিতার সংকলন: Just Give Me a Cool Drink of Water `fore I Diiie, Oh Pray My Wings Are Gonna Fit Me Well, And Still I Rise, Shaker Why Don’t You Sing? মায়া তার দীর্ঘ কবিতা On the Pulse of Morning ২০ জানুয়ারি, ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের প্রেসিডেন্সী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেন। কবিতা ও উপন্যাস ছাড়াও নাটক ও সিনেমায় মায়ার জনপ্রিয়তা রয়েছে। ফিল্ম, ‘জর্জিয়া জর্জিয়া’র স্ক্রীনপ্লে এবং মিউজিক্যাল স্কোর লিখেছেন। আমেরিকার জীবনে আফ্রিকান ঐতিহ্যের ওপর দশ পর্বের টিভি সিরিজের প্রযোজনা করেছেন। অনেক অনারারী ডিগ্রীতে ভূষিত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার কতৃক ‘ন্যাশনাল কমিশন অন দ্য অবজারভেনস্ অব ইনটারন্যাশনাল উইমেনস্ ইয়ার’-এ নিযুক্তি লাভ করেন। তিনি আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য। ‘আই নো হোয়াই দ্য কেইজড্ বার্ড সিংস্’ এবং ‘সিসটারস্’ এর টেলিভিশন স্ক্রীনপ্লে লিখেছেন। অতি সাম্প্রতিক ‘কিং: ড্রাম মেইয়র ফর লাভ’ মিউজিক্যালের লিরিকগুলো তারই লেখা। মায়া উইন্সটন-স্যালেম, নর্থ ক্যারোলাইনার ওয়েইক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটির আমেরিকান স্টাডিজের রেইনল্ডস্ প্রফেসর ছিলেন। তিনি নর্থ ক্যারোলাইনার উইন্সটন, স্যালেমে, নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন, ২৮ মে ২০১৪।]

স্পন্দিত সকালে


একটি পাথর, একটি নদী, একটি বৃক্ষ
প্রজাতির পালক যাত্রা শুরুর সুদীর্ঘ সময় থেকে,
চিহ্নিত বিলুপ্ত হাতি,
ডাইনোসর, যারা রেখে গিয়েছে শুষ্ক নিদর্শন
স্বল্প জীবনের
আমাদের গ্রহের চত্বরে,
তাদের দ্রুত বিলয়ের বৃহৎ ঘন্টাধ্বনি
যুগ ও ধুলোর অন্ধকারে হয়েছে বিলীন।

কিন্তু আজ, পাথর কেঁদে ওঠে, স্পষ্ট দৃঢ়তার বলে আমাদের,
এসো, দাঁড়াও তোমরার আমার
পীঠের ওপর এবং মুখোমুখি হও তোমাদের সুদূর নিয়তির,
কিন্তু কোনো স্বর্গ খুঁজো না আমার ছায়ায়,
লুকানোর কোনো স্থান আমি দেবো না এখানে।

তোমরা ফেরেশতার চেয়ে সামান্য নিম্নতর হয়ে
সভয়ে সিঁটিয়ে আছ বহুদিন
গুমোট অন্ধকারে
পড়ে আছ কতকাল অলস
অজ্ঞতায় নতমুখ,
তোমাদের মুখগুলো উগরে দেয়
হত্যাযজ্ঞের সশস্ত্র শব্দমালা।

পাথর আজ কেঁদে ওঠে আমাদের কাছে,
দাঁড়াতে পারো তোমরা আমার ওপরে,
তবে লুকিও না তোমাদের মুখ।
পৃথিবীর দেয়াল বরবার
গান গেয়ে চলে একটি নদী। বলে,
এসো, আমার পাশে একটু দাঁড়াও।

তোমরা প্রত্যেকেই একটি সীমানাঘেরা দেশ,
পলকা ও অদ্ভুত অন্ধকারে গড়া,
তবু চিরকাল অধীনতার তৃষ্ণায় কাতর।
তোমাদের প্রবৃদ্ধির সশস্ত্র সংগ্রাম
নিষ্ফলার গলা-বন্ধনী ফেলে গিয়েছে
আমার সৈকতে, ময়লার স্রোত আমার বুকের ওপর।
তবু আজ ডাকি তোমাদের আমার নদীর তীরে,
তোমরা যদি আর যুদ্ধের অধ্যয়ন না করো।

এসো শান্তির পোশাক পরে
এবং আমি সেই গান গাইবো
যা স্রষ্টা শিখিয়েছিলেন যখন
বৃক্ষ পাথর আর আমি এক ছিলাম।
বিশ্ব নিন্দাবাদ তোমাদের ভুরুর ওপর রক্তাক্ত ছাপ ফেলার আগে
এবং যখন তোমরা জেনেছ এতদিনে, তবু
জানো নি কিছুই।
গান গাইলো নদী, গেয়ে চলে এখনো।

সত্যিকার সাড়া দেবার ব্যাকুলতা আছে
এই সংগীতময় নদী আর বিজ্ঞ পাথরের ডাকে।
তাই বলো, এশিয়ান, হিসপানিক, ইহুদী,
আফ্রিকান, আদী আমেরিকান, সিঅকস্,
ক্যাথলিক, মুসলিম, ফেন্স, গ্রীক,
আইরিশ, রাবাই, যাজক, শিখ,
গেই, সাধারণ, ধর্মপ্রচারক,
সচ্ছল, গৃহহীন, শিক্ষক,
তারা শোনে। তারা সবাই শোনে বৃক্ষের কথা
তারা শোনে শুরু ও শেষ
মানব জাতির কাছে বলা প্রতিটি বৃক্ষের কথা।
এসো আমার কাছে
এইখানে নদীর পাশে।
রোপন করো নিজেকে নদীর ধারে।

তোমরা প্রত্যেকেই প্রয়াত কিছু
যাত্রীর উত্তরপুরুষ, পরিশোধ হয়েছে তোমাদের দেনা।
তোমরা, যারা আমার প্রথম-নাম রেখেছিলে, তোমরা,
প্যনি, অ্যাপাসি, সেনেকা, তোমরা
চেরোকি জাতি, যারা আমার সাথে ছিল, তারপর
রক্তাক্ত পায়ে সজোরে
ছেড়ে গেল আমাকে
অন্য অনুসন্ধানীর খোঁজে, প্রাপ্তির প্রত্যাশায় ব্যাকুল
বুভুক্ষু স্বর্ণের জন্যে।

তোমরার টারকিশ, আরব, সুইডিশ,
জার্মান, এস্কিমো, স্টটিশ,
ইটালিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান, পোলিশ,
তোমরা আশান্তি, ইওরুবা, ক্রু, ক্রীত
বিক্রীত, হারানো, দুঃস্বপ্নে ভেসে ভেসে
স্বপ্নের প্রার্থনায় রত।

এইখানে, শিকড় গেড়ে দাও আমার পাশে
আমি নদীর কিনারে রোপিত সেই বৃক্ষ,
সরানো হবে না কখনো।
আমি পাথর, আমি নদী, আমি বৃক্ষ,
আমি তোমাদের, —তোমাদের পথের দেনা শোধ হয়েছে।
তোমাদের মুখমণ্ডল তোলো, তোমাদের প্রচণ্ড প্রয়োজন রয়েছে।
এই সমুজ্জ্বল সকালে স্নিগ্ধ ভোর বয়ে আনবার।
ইতিহাস তার যন্ত্রণার মোচড় সত্ত্বেও
অজীবি হতে পারে না; কিন্তু যদি মুখোমুখি হওয়া যায়
সাহসে, প্রয়োজন পড়ে না বাঁচার আবার।

তোমাদের চোখ রাখো
এই সুহাসিনী ভোরের ওপর।
সূচনা করো আবার শোভন স্বপ্নের।
নারী, শিশু, পুরুষ
তোমাদের হাতের তালুতে তুলে নাও সেই স্বপ্ন,
গড়ে নাও তোমাদের সবচেয়ে
পোপন প্রয়োজন। খোদাই করো তোমাদের সবচেয়ে
মূর্ত সত্তার প্রতিমূর্তি।
অন্তর তোলো তোমাদের।
প্রতিটি নতুন মুহূর্ত নতুন সম্ভাবনা ধরে আছে নতুন প্রারম্ভের।
বন্ধন রেখো না চিরদিন
ভয়ের সংগে, দাসত্বে বেঁধো না চিরকাল পাশবিকতার।

দিগন্ত ঝুঁকে আছে সম্মুখে
স্থান করে নিতে তোমাদের
পালা বদলের নতুন ধাপের স্থান করে দিতে।
এইখানে, এই শিহরিত সুন্দর দিনে,
সাহসে ভর করে আছ
দেখতে চারদিক এবং আমাকে,
পাথর, নদী, বৃক্ষ, তোমাদের জন্মভূমি।
ভিখারীর চেয়ে কম নয় ফ্রিজিয়ার নৃপতির কাছে।
বিলুপ্ত প্রজাতির হাতির চেয়ে কম নয় এখনকার
তোমাদের কাছে।

এইখানে, নতুন এই স্পন্দিত দিনে,
তোমরা পেতে পারো আশির্বাদ, দেখতে চারদিক
এবং তোমাদের বোনের চোখে,
এবং তোমাদের ভায়ের মুখে,
তোমাদের স্বদেশ,
এবং শুধু বলো
কেবল এতটুকু
আশা নিয়ে—
শুভ সকাল।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...