বাবার স্মৃতি: শ্রাবণের মেঘ নেমে আসে | কুমার দীপ

176
bdtruenews24.com

কতোদিন হলো, তোমাকে দেখি না! কতো দিন গ্যালো, তোমার সাথে কোনো কথা হয় না! কতো বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলো; আমি বাড়ি ফিরলাম কতো বার… তবু তোমার গলা খাঁকারি শুনতে পেলাম না! অথচ আমার অপেক্ষাতেই কেটেছে তোমার কতো বিকেল-সন্ধ্যা-রাত! প্রায় এক মাইল দূরের বাসস্ট্যান্ডে এসে, শহর ফেরত বাসগুলোর পা-দানির দিকে তাকিয়ে তোমার প্রহর কাটতো। তখন মোবাইল ফোন ছিলো না। আমার চিঠির উপর ভরসা করেই তোমাকে পাঠিয়ে দিতো মা। চিঠির তারিখ প্রায়ই পরিবর্তিত হতো। পর পর কয়েক দিন তোমাকে অপেক্ষা করতে হতো। কখনও এমন হয়েছে যে, কয়েক দিন অপেক্ষা করে, পরের দিন তুমি আসো নি। আমি এসে গেছি। বাস থেকে নেমে, এদিক ওদিক তাকিয়ে তোমাকে না পেয়ে, দুরু দুরু বুকে পা চালিয়েছি বাড়ির দিকে। শৈশব থেকেই রাতের পথে তুমিই ছিলে আমার অনির্বাণ আলোক শিখা। কোনো আলো ছাড়াই কতো অন্ধকারে অনায়াসে পথ চলতে তুমি! শেষ বিকেলে ওই যমুনার গাঙে (এক কালে বিরাট নদী ছিলো, এখন খাল।) মাছ ধরতে গিয়ে রাত্রি হয়ে গেলে; গাঁয়ের ঘনো ঘোর আঁধার পথে আমার নতুন চোখ হোঁচট খেলেও তোমার পায়ে কোনো দ্বিধাই দেখিনি। একটু বড়ো হলে যদিও বুঝেছি, গ্রামের অধিকাংশ মানুষই অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে; তবু তুমিই আমার সেরা।

একটু রাত হলেই সাড়া-শব্দহীন ঘুমিয়ে পড়া গ্রাম্যজীবনের প্রায় অনিবার্য অনুষঙ্গ তখন। আমাদের বাড়িতেই যেটুকু রাত হতো আমাদের পড়ালেখা আর মায়ের রান্নার দেরির কারণেই। মাধ্যমিক পরীক্ষার বছর থেকেই এই অনুষঙ্গের বাইরেও; আমার রাত্রি জাগার অভ্যাস হয়ে যায়। কিন্তু ভয় যে একেবারে চলে যায়, তা নয়। গল্প-উপন্যাস পাঠ কিংবা নিজের কল্প-কবিতার ভেতর থেকে উঠে, মাঝরাতে যখন ব্রাশ হাতে বাইরে বের হতাম; পুকুর থেকে বদনায় জল নিয়ে বাগানের শেষ কোণের টয়লেটে যেতাম; গা ছম ছম নীরবতায় কোনো দেবতা-টেবতা নয়, তুমিই ছিলে প্রধান ভরসা। তুমি জেগে থাকতে কি না জানিনে, কিন্তু বারান্দায় শুয়ে থাকা তোমাকে মাত্র একটি বার ‘বাবা’ বলে ডাক দিলে তুমি যেভাবে সাড়া দিতে, মনে হতো তুমি ঘুমোওনি; ঘুমোও না কোনো রাতে! তুমি কি সত্যিই ঘুমোতে না বাবা? হয়তো ঘুমোতে। আসলে সন্তানের ছোট্ট একটি ‘বাবা’ ডাকের কী যে শক্তি, তখন না বুঝলেও এখন কিছুটা বুঝি! অবশ্য সন্তানের জন্যে অতি স্নেহ বা আদিখ্যেতা তোমার ভেতরে কোনো দিন দেখি নি। খুব উদ্বিগ্ন হতে দেখেছি বলেও মনে পড়ে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত তোমার বড়ো মেয়ের মৃত্যুর খবর যেদিন এলো, দুপুরের ভাতের থালায় তোমার নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখে মনে হলো, বাবাদের স্নেহ-উদ্বিগ্নতা সবসময় সন্তানের চোখে ধরা পড়ে না।

বাবা! খুব সরল; আমি বলবো বোকাই ছিলে তুমি! তাই তোমার জীবনের অনেকটা সময়ই ছিলো দুঃখে মোড়ানো। প্রথম তারুণ্যে বাউণ্ডুলে স্বভাবের জন্য দশ ক্লাসের বেশি পড়ো নি। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চাকরিটিও করো নি। বিয়ের পর সেই আমলের ৬ষ্ঠ শ্রেণি পড়া বউকেও করতে দাওনি পরিবার-পরিকল্পনা বিভাগের যেচে দেওয়া চাকরিটাও। তোমার বাবার অনেক জমি-জায়গা থাকলেও তাঁর অকালপ্রয়াণের পর তোমার কাকাদের চক্রান্তে প্রায় সহায়-সম্বলহীন তুমি কী বিপদেই না পড়ে গিয়েছিলে! তোমার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সামর্থ্যের অপ্রতুলতা আর তাদের অনিচ্ছার কারণে লেখাপড়া এগোয়নি অধিকাংশ সন্তানেরই। সেজো ছেলেটা কয়েক বছরের বিরতি শেষে আবারও লেখাপড়া শুরু করলেও কলেজের গণ্ডিতেই তা আটকে গ্যালো। আজকের দিনের মতো ছোটো পরিবার থাকলে যার জন্মই হতো না, সেই সর্বশেষ আমিই একদিন তোমার সুপ্ত স্বপ্নের সারথী হয়ে উঠলাম। সে আরেক অনড় সংগ্রাম। দরিদ্রতার কষাঘাত শব্দটার অর্থ সেদিন না জানলেও, জানতাম আমার বাবা খুব গরিব। প্রয়োজনীয় কাপড়ের অভাবে প্রায়ই গামছা পরে বাড়িতে কাটায়, পছন্দের খাবার না পেয়ে আধা পেটেই উঠে যায়; পরিবারের কারো আবদারই মেটাতে পারে না। তবে আমি যখন কাগজ-কলমের কথা বলতাম, ক্ষেতের কোনো সবজি, গাছের কোনো ফল; যে কোনো কিছুই হাটে নিয়ে যেতে তুমি। কিছুই না পেলে বাকি করেই আনতে। বইয়ের কথা বললে, মামার বইয়ের দোকানে গিয়ে ধরনা দিতে হাটের পর হাট। খাবার বলতে চার আনা-আট আনা, বড়ো জোর এক টাকার মিষ্টিমুড়ি কিংবা ছোলাভাজাই ছিলো সম্বল। নতুন কোনো জামা-কাপড় কিংবা এক জোড়া জুতো তোমার নিকট থেকে পেয়েছি কি না মনে পড়ে না। মাঝে-মধ্যে হয়তো রাগও করেছি। কিন্তু প্রায় খালি পায়েই অজস্র মাইল পথ পাড়ি দেওয়া তোমার অসহায়ত্ব দেখে দেখে পরের পুরনো জামা কিংবা অনেক দিন বাদে দাদার দেয়া চটিজুতোতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি একসময়।

মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি তোমার ছিলো সীমাহীন আগ্রহ। এক কলস গুড় এক সপ্তাহে একা খাওয়া কিংবা কেরোসিন পড়া এক কেজি চিনি এক বসাতেই সাবাড় করার গল্প ছিলো তোমার। মা পিঠে-পায়েস তৈরির কথা বললে, যে কোনো মূল্যেই মিষ্টি নিয়ে হাজির হতে তুমি। পছন্দের খাবার পেলে উৎফুল্লতায় ভরে উঠতে তুমি। অথচ প্রায়ই ঘটতো এর উল্টোটা। ক্যাম্পাসে নিদারুণ অর্থকষ্টে মাঝে মধ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতাম আমি। কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন দেখতাম, দাদারা প্রাণান্ত খাটছে, মা মাঝে মাঝে আধপেটা থাকছে, আর তুমি একটা শুকনো ঝাল নিয়ে ঘষছো ভাতের থালায়, মাঝে-মধ্যে উঠে যাচ্ছো খাওয়া শেষ না করে; খুব খারাপ লাগতো, অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকে ভাবতাম: ক’বে তোমাকে দু’মুঠো খেতে দিতে পারবো স্বস্তি মতো! সামান্য ধানের জমিটুকুও বন্ধক রেখে, ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে যখন পড়ালেখা শেষ করে ফিরলাম- তোমার তখন পড়ন্তবেলা।

মাস্টার্সের ফল প্রাপ্তির বছর খানেক বাদে চাকরিটা পেয়ে গেলেও তোমাকে সেবা করবার সেরকম সুযোগ পেলাম কই? তোমার বুকে ব্যথার খবরটা পেয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম; শ্যামনগর হাসপাতালের বিছানায় তুমি তখন অচেতনপ্রায়। অভিজ্ঞরা বুঝে নিয়েছিলো ভবিষ্যৎ, কিন্তু আমি হাল ছাড়াতে রাজি ছিলাম না। সেদিন বিকেলেই তোমাকে নিয়ে রওনা দিলাম খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ডাক্তারের সাথে ব্যক্তিগত আলাপে আমিও বুঝেছিলাম কী হতে পারে। কিন্তু প্রখর বাস্তববাদী লোকও একান্ত আপনজনের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় ম্যাজিক প্রত্যাশা করে।

আর তুমিও প্রায় মুমূর্ষু অবস্থা কাটিয়ে সুস্থ হয়ে উঠছিলে। সেদিন সকাল থেকে তুমি নিজেই এতো উৎফুল্ল ছিলে যে, বাড়িতে কেউ নেই বলে মা’কে বাড়ি পাঠিয়ে দিলে। কয়েক দিন বাদে দুপুরে মাছের ঝোল দিয়ে দুটো ভাত খেলে! তোমাকে খাইয়ে দিয়ে বড়দা’ থালা ধু’তে গ্যালো, ছোটদা’ জিনিসপত্র গোছাতে লাগলো, আর তুমি তৃপ্ত মনে বসে আমার সাথে গল্প করছিলে। আমি বললাম, ‘বাবা, অনেক কথা হলো। এবার তুমি শোও।’ তুমি বললে, ‘শোবো তো, ৩/৪ দিন ধরে আমি তো প্রস্রাব-পায়খানা করিনে। না হলে স্বস্তি পাচ্ছিনে।’ ক্রনিক আমাশাস্বভাবী বাবাকে চিরদিন দেখেছি দিনে ৪/৫ বার বদনা হাতে নিতে। সেই লোক ৪/৫ দিন! ডাক্তারের সাবধানবাণী ছিলো। তাই বিছানাতে বসিয়েই প্রস্রাব করানোর চেষ্টা করছিলাম আমরা। ছোটদা তোমাকে ধরলো। আমি ধরলাম আড়ালকাপড়। কিছুক্ষণ চেষ্টা করতে দেখে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাবা, হচ্ছে?’ তুমি আমার দিকে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে না সূচক মাথা নেড়েই নীরবে বিছানায় ঝরে পড়লে! নার্স এলো, ছোটদা বাবা বলে কেঁদে উঠলো, বড়দা এসে বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো; আর আমি বোবার মতো তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম! বাড়ি নিয়ে সবাই যখন কেঁদে কেঁদে হয়রান, তখনও আমি নির্বাক কাজ করে যাচ্ছি। তারপর তোমার শরীরটাকে যখন আগুনের লেলিহান শিখায় নিশ্চিহ্ন দেখছিলাম; তোমার ওই মুখখানা থেকে আর কখনও আমার নাম শুনতে পাবো না ভাবছিলাম; তোমার শক্ত পা’দুটোতে আর কোনো দিন প্রণাম করতে পারবো না বলে মনে হচ্ছিলো; যখন নিশ্চিত হচ্ছিলাম, আমার জন্যে আর কোনো দিন তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে না; বহুদিন পরে বাড়ি ফিরে ডেকে ডেকেও তোমার সাড়া পাবো না; ভেতরটা পিপাসার্ত মরুভূমির মতো হা হা কার করে উঠলো! নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না; শিশুর মতো হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলাম। কাঁদতে কাঁদতে সমস্ত শরীর আমার অবশ হয়ে আসছিলো… আমি অচেতন হয়ে যাচ্ছিলাম… সবাই ছুটে আসছিলো। এসেছিলো ডাক্তারও।

আজ এই রাত্রি তৃতীয় প্রহরে তোমাকে স্মরণ করতে গিয়ে আবারও কাঁদছি আমি। নীরবে। আমার জীবনে ধ্রুবতারার মতো কিছু ছিলে না তুমি। সরলতা ছাড়া বলবার মতো কোনো আদর্শও স্থাপন করো নি সামনে। তবু তোমার কথা মনে পড়লে আজও শ্রাবণের মেঘ নেমে আসে মনে আকাশে। বাড়িতে-বাসায় ভালো কোনো খাবারের আয়োজন হলে তোমার কথা মনে পড়ে।

ভারাতুর মনে, চোখে জল নিয়ে আজও মাঝে-মাঝে ভাবি: নিজের সামনে বসিয়ে ঝাল পোড়ার পরিবর্তে যদি এরকম খাবার দিয়ে তোমাকে দু’মুঠো খাওয়াতে পারতাম! কোনো কোনো মানুষের জীবনে দুঃখটাই সত্য হয়ে থাকে; দুঃখ উত্তর জীবনের সুখযাপন ভাগ্যে কুলোয় না। হায়, তুমিও আমার সেই মানুষদের দলেই চলে গেলে, বাবা!

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: