বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ট্র্যাজেডি

20 views
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ট্র্যাজেডি

১৯৯২ সালের এই কলঙ্কিত দিনে উগ্রহিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ভারতের উত্তর প্রদেশের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে পরিকল্পিতভাবে ধূলিসাৎ করে দেয়। ধর্মের নামে ইতিহাস বিকৃত করে তারা প্রচারাভিযান চালিয়েছে যে, বাদশাহ বাবর রামমন্দির ধ্বংস করে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের হোতা যে ‘সঙ্ঘ পরিবার’, ভারতে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপি দল তাদের অন্তর্ভুক্ত। এ দলের বিপুল নেতাকর্মীও সে দিন আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উগ্রপন্থীদের সাথে শামিল হন বাবরি মসজিদ ধ্বংসযজ্ঞে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা ভারতের কংগ্রেস সরকার তখন ক্ষমতায় ছিল; কিন্তু সে সরকার, পুলিশ ও প্রশাসন এই জঘন্য কর্মে কোনো বাধা তো দেয়ইনি, বরং বাবরি মসজিদ যাতে অবাধে ভেঙে ফেলা যায়, সে ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল।

ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ। কট্টর হিন্দুরা এই মসজিদ ধ্বংসের তাণ্ডবকে কেন্দ্র করে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছিল। অপর দিকে ভারতের সত্যিকার গণতন্ত্রকামী ও অসাম্প্রদায়িক মহলসমেত বিশ্বের বিবেকবান মানুষমাত্রই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তীব্র নিন্দায় হয়েছেন সোচ্চার। এই মসজিদের ব্যাপারে দায়েরকৃত মামলার রায় দীর্ঘ দিন পর দেয়া হলে দেখা যায়, এতে মসজিদের চত্বরেই মন্দির নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদ ধ্বংসের নারকীয় ঘটনা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ার দাবিদার ভারতের ইতিহাসে দূরপনেয় কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

বাবরি মসজিদের গায়ে উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায়, ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মোহাম্মদ বাবরের নির্দেশে মীর বাকী ১৫২৮-২৯ সালে এটি নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদ বিরাট উত্তর প্রদেশের বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হতো। বাবরি মসজিদ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত এবং মামলা-মোকদ্দমার সূচনা হয়েছে এটি নির্মাণ করার কয়েক শ’ বছর পর। দেশী-বিদেশী ইতিহাস গবেষকদের লিখিত বইপুস্তক এবং নির্ভরযোগ্য নথিপত্রের ভিত্তিতে বলা যায়, মন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কল্পকাহিনী একে তো ভিত্তিহীন, তদুপরি মুসলিমবিরোধী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিই এর উদ্দেশ্য।

জানা যায়, ১৮৫৩ সালে একদল হিন্দু ‘সাধু’ সর্বপ্রথম বাবরি মসজিদ চত্বর দখল করে এর ওপর মালিকানা দাবি করেছিলেন। ফলে পরের দুই বছর এ নিয়ে মাঝে মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় প্রশাসন এখানে মন্দির নির্মাণের অনুমতি যেমন দেয়নি, তেমনি এটাকে প্রার্থনার জন্য ব্যবহার করতে দিতে চায়নি। ১৮৫৫ সালে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষের পর মসজিদের সীমানা দেয়াল তোলা হয় যাতে বিবাদ এড়ানো যায়। এরপর মুসলমানরা দেয়ালের ভেতরে নামাজ পড়তেন এবং হিন্দুরা বাইরে একটি উঁচু চত্বরে পূজা করতেন। ১৮৮৩ সালে এই চত্বরে মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলে মুসলমানরা প্রতিবাদ জানান এবং প্রশাসন মন্দির নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তখন জনৈক হিন্দু পুরোহিত দেওয়ানি মামলা করেন। জবাবে মসজিদের মুতাওয়াল্লি বলেন, পুরো জমিটাই বাবরি মসজিদের সম্পত্তি। একজন হিন্দু বিচারকই পুরোহিতের মামলা খারিজ করে দেন। এর বিরুদ্ধে পরপর দুইবার আপিল করা হলে সেটাও খারিজ হয়ে যায়।

এরপর প্রায় অর্ধশতাব্দী কেটে যায়। ১৯৩৪ সালে অযোধ্যায় দাঙ্গা বাধলে দাঙ্গাকারীরা মসজিদের দেয়ালগুলো এবং একটি গম্বুজের ক্ষতি করে। সরকার তা পুনর্নির্মাণ করে দেয়। ১৯৩৬ সালে আইন মোতাবেক বাবরি মসজিদ ও সংলগ্ন গোরস্তান ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে রেজিস্ট্রি করা হয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরই বাবরি মসজিদ ইস্যু চরম আকার নিয়েছে। ১৯৪৯ সালে ‘অখিল ভারতীয় রামায়ণ মহাসভা’ মসজিদের ঠিক বাইরেই ৯ দিন ধরে অবিরাম রামচরিতমানস পাঠের আয়োজন করে। এই কর্মসূচি শেষ হওয়ার সাথে সাথে রাতের বেলায় ৫০-৬০ জন মসজিদে ঢুকে রাম ও সীতার মূর্তি সেখানে স্থাপন করে। পরদিন মাইকে ঘোষণা দেয়া হলো, ‘বাবরি মসজিদের ভেতরে অলৌকিকভাবে মূর্তির আবির্ভাব ঘটেছে।’ এটা দর্শন করে পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য ভক্তদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

ফলে হাজার হাজার হিন্দু নর-নারী সেখানে আসতে শুরু করেন। এ অবস্থায় সরকার মসজিদটিকে ‘বিতর্কিত এলাকা’ ঘোষণা করে গেটে তালা লাগিয়ে দেয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল নাকি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বাবরি মসজিদ থেকে মূর্তি সরিয়ে দেয়ার জন্য; কিন্তু ফয়জাবাদের হিন্দু জেলা প্রশাসক ‘জনতার প্রতিশোধের ভয়ে’ এ আদেশ পালন করেননি। সেখানে রাম-সীতার পূজার অনুমতির জন্য মামলা করা হয়। ১৯৫৯ সালে এই মসজিদের দখলিস্বত্ব পাওয়ার জন্য হিন্দুদের একটি ধর্মীয় সংগঠন মামলা করে। পরে সুন্নি মুসলমানদের ওয়াক্ফ বোর্ড মসজিদ থেকে মূর্তি সরিয়ে জায়গাটার মালিকানা তাদের দেয়ার জন্য মামলা করেছিল।

১৯৮৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ‘মন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণ’ করার প্রচারণা চালায় দেশব্যাপী। এ জন্য রথযাত্রার আয়োজন করা হয়। ’৮৬ সালে মসজিদটিতে পূজার অনুমতি চেয়ে আবার মামলা করা হলে কংগ্রেসের রাজীব গান্ধী সরকার জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে মসজিদ গেটের তালা খোলার নির্দেশ দেয়। এর আগে থেকেই একজন পুরোহিত বছরে একবার সেখানে পূজা করতেন। এবার সব হিন্দু প্রবেশের অধিকার পাওয়ায় মসজিদটি অনেকটা মন্দিরের রূপ ধারণ করে। এ দিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সেখানে শিলান্যাস বা ‘প্রস্তর স্থাপন’ অনুষ্ঠানের অনুমতি পেয়ে যায়। ’৯২ সালে বিজেপির শীর্ষ নেতা এল কে আদভানির নেতৃত্বে ১০ হাজার কিলোমিটার রথযাত্রা করা হয় বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির স্থাপনের লক্ষ্যে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। ৬ ডিসেম্বর কয়েক হাজার সাম্প্রদায়িক লোক পূজা করা এবং ‘করসেবা’র লক্ষ্যে বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে সমবেত হয়। একপর্যায়ে তারা মসজিদটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। ভারত সরকারের গঠিত ‘লিবেরহান কমিশন’ তদন্ত করে এল কে আদভানি, অটল বিহারি বাজপেয়ী ও কল্যাণ সিং (মুখ্যমন্ত্রী)সহ ৬৮ জনকে দায়ী করেছে বাবরি মসজিদ ধ্বংসযজ্ঞের জন্য।

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন , বিডি ট্রু নিউজ ২৪ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

Loading Facebook Comments ...