বাজেট পর্যা‌লোচনা: স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব | গোলাম সারোয়ার

464
bdtruenews24.com

২০১৬-১৭ অর্থ বছরের বাজেটকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রার বাজেট। যে কোন দেশের চলমান সরকার দ্বারা বৃত্তের বাইরে গিয়ে বাজেটে বিস্ময়কর পরিবর্তন আশা করা যায় না। তবুও বাজেটে আমরা অর্থমন্ত্রীর এই শ্লোগানের প্রতিরূপ দেখতে চেয়েছি। আগামি অর্থবছরের মোট বাজেট হলো, ৩.৪০,৬০৫ কোটি টাকা।

এই বাজেটে স্বপ্ন আছে, চ্যালেঞ্জও আছে। বাজেটের সবচেয়ে বেশি যে চ্যালেঞ্জ আমরা দেখি তা হলো, ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়। এটিই আসলে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা সম্বন্ধে আমরা সবাই জানি। তার উপর আছে কর্মকর্তাদের দুর্নীতি। রাজস্ব কর্মকর্তাদের দৃশ্যমান কোন চারিত্রিক উন্নতি আমাদের চোখে পড়েনি। মনে রাখতে হবে, বর্তমানে এনবিআরের কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৬ শতাংশ। কিন্তু আগামী অর্থবছরে আদায় করতে হবে ৩৫ শতাংশেরও বেশি।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। যেহেতু গত কয়েক বছর যাবত ৬ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেছে এবার এ আশা ক‌ঠিন হ‌লেও করাই যায়।

পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সুসম্পর্কের ইঙ্গিতে বলা যায় প্রবাসী আয় বাড়বে। বিশ্ব অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারলে এবং রপ্তানী শিল্পের গ‌তিশীলতা ধরে রাখতে পারলে রপ্তানি আয়ে আরও প্রবৃদ্ধি হবে।

বাজেটের ঘাটতি হলো ৯২,৩৩৭ কোটি টাকা। এর বেশির ভাগই মিটানো হবে ঋণ করে। ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা এবং সঞ্চয়পত্রের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকছে। এতে সুদ বাবদ ব্যয় বেড়ে যাবে। আমি মনে করি এটিও অর্থনীতির জন্যে সুফলদায়ক। তার কারণ দু‌টো। প্রথমত ব্যাংকে অর্থ পড়ে আছে অলস।

আবার সরকারের সঞ্চয়পত্র বাবদ ব্যয় বাড়ার অর্থ হলো জনগণের আয় বাড়া। জনগণের আয় বাড়লে ভোগব্যয় বাড়বে। ভোগ ব্যয় বাড়লে সরবরাহ বাড়ানোর জন্যে উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃ‌ষ্টি হবে। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

উন্নয়ন বাজেট ধারাবহিকভাবে খরচ করতে না পারাটা দেশে ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। খরচ করতে না পারার কারণ হলো সঠিক জায়গাতে দক্ষ লোকের অভাব। সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করতে পারলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে এবং উন্নয়নে গতি সঞ্চার হয় না। দক্ষ জনশক্তি পেতে হলে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

আগামি বাজেটে শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্ধ রাখা হয়েছে ৫০,০১৭ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ২.৫ শতাংশ। ইউনেসকোর মতে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখতে হবে জিডিপির ৬%। দক্ষিণ এশিয়াতে চলতি অর্থবছরে শিক্ষা ক্ষেত্রে ভুটান জিডিপির ৫.৫%,  আফগানিস্তান ৪.৬%,  নেপাল ৪.১%,  ভারত ৩.৯%,  পাকিস্তান ২.৫% বরাদ্ধ রেখেছেন। সেখানে আমাদের ছিলো মাত্র ১.৯%। এবার ২.৫% রাখা হলেও আমরা মনে করি তা অনেক কম।

তবে সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তারজন্যে মানুষের মাঝে আস্থা ফিরাতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরাতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে। আইন শৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে। গত দুই বছরে বেসরকারী বিনিয়োগে তেমন আশা জাগানিয়া কিছু হয়নি।

বাংলাদেশে বর্তমানে টাকার হিসেবে জিডিপি ধরা হয়েছে ১৯,৬১,০১৭ কোটি টাকা। ২০১৪–১৫ অর্থ বছরে বেসরকারী বিনিয়োগ হয়েছে জিডিপির ২২.০৭% এবং ২০১৫–১৬ অর্থবছরে ২১.৭৮%। বিবিএসের হিসাবেই গত দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। অথচ প্রতিবছর ২১ লাখ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।

বর্তমানে শ্রমশক্তিতে ৬ কোটি ১৪ লাখ নারী-পুরুষ আছেন। মোট শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মরত লোকের সংখ্যা ৫ কোটি ৮৭ লাখ। বাকীদের কর্মসস্থান সৃষ্টি করতে হলে বেসরকারী বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তবে মনে রাখতে হবে, দক্ষ জনশক্তির অভাবও কিন্তু আমাদের আছে। দক্ষজনশক্তি সৃষ্টি করতে হলেও শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিখাতে বরাদ্ধ বাড়াতে হবে।

দক্ষতার ঘাটতির কারণেই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থে‌কে আমরা পিছিয়ে আছি। বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন ও প্রবাসী আয়ের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের একজন অভিবাসী গড়ে দেশে পাঠিয়েছেন ২ হাজার ৭৮ ডলার। অথচ একই সময়ে ভারতের অভিবাসীরা মাথাপিছু পাঠিয়েছে ৫ হাজার ১৯৪, ফিলিপাইনের ৪ হাজার ৯৫০, ভিয়েতনামের ৪ হাজার ৭৩০, নেপালের ৩ হাজার ৩০০ এবং পাকিস্তানের ৩ হাজার ২৪১ মার্কিন ডলার।

মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এ অর্থবছরে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১০ মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ পণ্যমূল্য কমার সম্ভাবনার নিরিখে বলা যায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

যোগাযোগ ক্ষেত্রে উন্নতির জন্যে যানজট নিরসনে স্বতন্ত্র মেট্রোপলিটন যোগাযোগ কর্তৃপক্ষ গঠনের চিন্তা ভাবনাকে স্বাগত জানাই। স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানকে হালনাগাদ করে এর আওতায় প্রস্তা‌বিত তিনটি তিনস্তর বিশিষ্ট সার্কুলার রুট, ৫টি এমআরটি লাইন ও ২টি বিআরটি লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে উন্নয়নে গতি সঞ্চার হবে। কারণ যোগাযোগ হ‌লো উন্নয়‌নের পথ‌রেখা।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন আগামী অর্থবছরের মধ্যেই ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন করবেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জনস্বার্থ বিষয়ক সংস্থাগুলোর ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংকে একটি সুনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনার জ‌ন্যে, হিসাব ও নিরীক্ষা  পেশার প্রমিতমান প্রণয়ন করার জ‌ন্যে, প্রতিপালন, বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন, ২০১৫ পাস করা হয়েছে। কিন্তু কাউন্সিলটি এখনও প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। এ কাজটি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে পারলে অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া যাবে। আর ব্যাংক ও আ‌র্থিকখা‌তে নিয়ন্ত্রণ আনা গে‌লে আমা‌দের আর পিছ‌নের দি‌কে ফি‌রে তাকা‌তে হ‌বে না।

লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...