বাংলা সিনেমার বিবর্তন | শেষ কিস্তি || অলভ্য ঘোষ

 প্রডাকশন ম্যানেজার থেকে লাইন প্রডিউসার

163
bdtruenews24.com

প্রথম কিস্তি: বাংলা সিনেমার বিবর্তন | ১ম কিস্তি || অলভ্য ঘোষ

আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বেয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলন, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, ছেচল্লিশের দাঙ্গা ও সাতচল্লিশের দেশভাগ এ দেশের চলচ্চিত্রে তেমন ভাবে ছাপ ফেলেনি। চলচ্চিত্রকে শ্রেণি নিরপেক্ষ বিনোদনী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে গনচেতনায় বিভ্রান্তি তৈরি করা সম্ভব- আপাত সুখের নৈরাজ্যের অতলান্তে নিয়ে যাওয়া যায় সহজে। তাই সমাজ পরিবর্তন নয় মনোরঞ্জনের সুবাদে মুনাফা একেই চিরকালের দৃঢ় অবলম্বন করে আসছে হিন্দি চলচ্চিত্র।সাতের দশকেই বাংলায় ৩৫০ টি সিনেমা হলের মধ্যে ৬০-৬৮টিতে মাত্র বাংলা ছবি প্রদর্শিত হত। বাকি ২৮০ থেকে ২৯০ টি হল ছিল হিন্দি ছবির দখলে। ১৯৫৭ সালে ৫৪ টি বাংলা ছবি তৈরি হয়েছে। ১৯৭০ সালে সেটা দাঁড়ায় ২৫ টিতে। গান, রোমান্স, দারিদ্র্য বিলাসের বাংলা ছবি হিন্দি ছবির সাথে পাল্লা-দিতে রোজ বদলাচ্ছে। শুধু মুম্বাই থেকে নয় বিষয় ও আঙ্গিক ধার করছে দক্ষিণ থেকেও, অবহেলিত বাংলার সাহিত্য নির্ভরতা। রাজনৈতিক ফ্লেইভ্যার সম্বলিত অরাজনৈতিক ছবি নির্মাণ চলছে জোর কদমে। চলছে জনসাধারণের মানসিক বিপর্যয়কে হাল্কা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ঢঙে আর নতুন জট-পাকিয়ে দেওয়া। এই দৌড়ে বাংলা ছবিতে ঢুকেপড়েছে কর্পোরেট দুনিয়া। বাংলা ছবির বাজার বেড়ে গেছে পাঁচ ছয় গুন। উৎপাদন বেড়েছে কুড়ি শতাংশ। অ্যামেরিকা, Iceland, Newcastle, ব্যাংকক পৃথিবীর সেরা দর্শনিয় স্থানগুলো এখন বাংলা ছবির লোকেশন। যেখানে আগে ৪০ থেকে ৫০টি ছবি বাজারে নির্মিত হত এখন হয় ১০০ টারো বেশি। প্রথম দিনের মুক্তিতেই জিৎ অভিনীত বাংলা ছবি “বস” ঘরে তুলেনিতে সক্ষম হয়েছে ৭৫ লাখ টাকার ও বেশি। উৎপাদনের মান উন্নয়নে ও Packaging এবং Marketing এর দিকে লক্ষ রেখে বাংলার পরিচালকেরা এখন কর্পোরেট হাউস গুলোর দরজায় দাঁড়িয়ে। হলিউড ও বলিউডও কোলকাতায় আসছে শুটিং করতে। ফলে বাংলা ছবির হেঁসেল টাও যাচ্ছে পাল্টে প্রতি নিয়ত। মান্ধাতার আমলের প্রডাকশন ম্যানেজারের বদলে ইংরেজি বুলি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহারে সক্ষম কনভেন্ট স্কুলে পড়া ছেলে পুলে ঢুকে পড়ছে লাইন প্রডিউসার হয়ে।

লাইন কথার অর্থ পঙক্তি রেখা বা সারি। তার মানে লাইন প্রযোজকের বাংলা করা হলে তাকে সারি প্রযোজক বলাচলে। সারি প্রযোজক বা লাইন প্রডিউসারের উৎপত্তি হলিউডে। লাইন প্রডিউসার হয় এমন একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক যিনি কিনা ফিচার ফিল্ম, টেলিভিশন ফিল্ম অথবা টি.ভি অনুষ্ঠানের পর্বের প্রাত্যহিক কাজকর্মের কার্যনির্বাহী বিশেষ প্রতিনিধি। একজন সারি প্রযজোক একবারে একটির বেশি ছবিতে কাজ করতে পারেন না। তারা দায়বদ্ধ থাকেন চলচ্চিত্র নির্মাণ চলাকালীন মানব সম্পদের যোগানে এবং সকল প্রকার সমস্যার সমাধানে ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে।

অ্যামেরিকান প্রডিউসার গ্রিল্ড (PGA)য়ের নিয়ম অনুসারে লাইন প্রডিউসার একমাত্র ব্যক্তি যিনি একজন প্রযোজক বা একাধিক প্রযোজকের সাথে নির্মায়মান চলচ্চিত্রটির পুংখানুপুক্ষ বিবরণের তালিকা সহযোগে সরাসরি যোগাযোগ রেখে থাকেন। সব বিভাগের নেতৃবৃন্দ লাইন প্রযোজকের কাছে উৎপাদন কার্যের বিবরণ প্রতিবেদন বা রিপোর্ট পেশ করেন। এর থেকেই লাইন প্রডিউসার প্রযোজক বা প্রযোজকদের কার্যের উৎপাদন কর্মের গতি বা কর্ম অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিন্ত করেন।

লাইন প্রডিউসার পরিচালকদের ভাবনার বাস্তবয়ানে সহায়তা করেন; কখনোই তারা সৃজনশীলতায় হস্তক্ষেপ করেন না। স্বভাবতই তিনি সক্ষম হন প্রতিটি বিভাগের সম্পদের যোগানে ও কাজের গতি তরান্বিত করনে। তবে তিনি উৎপাদন মূল্যের কথা মাথায় রেখে সৃজনশীল পরিণাম থেকে ফিল্মের গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিবর্তন করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ তার পছন্দ অনুসারে চিত্রায়নের স্থান শিল্পের আঙ্গিককে প্রভাবিত করে প্রকল্পের চেহারাই বদলে দিতে পারে। পরিচালক সব বিশুদ্ধ শৈল্পিক সিদ্ধান্তের জন্য ভারপ্রাপ্ত; প্রযোজক তাকে সমস্ত রকম প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলোর সরবরাহ ও তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে পরিচালকের সৃজনশীল ধারনাটিকে মূর্ত করে তুলতে সাহায্য করে। লাইন প্রযোজকের মুখ্য উদ্দেশ্য চূড়ান্ত বাজেটকে সম্মান করা এবং সময় মতো তার যোগান দেওয়া। প্রাত্যহিক শুটিং এর যাবতীয় আবশ্যকীয় সিদ্ধান্তগুলো লাইন প্রযোজকের দ্বারাই গ্রহণ করা হয়। প্রশাসনিক দিক; বিশেষত যে দিকগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব বর্তমান সেই সমস্ত দিকগুলোকে সামলানোই লাইন প্রডিউসারের কাজ। শুধু ক্র সদস্যদের ক্ষতিপূরণ, মীমাংসা ও আপসেই লাইন প্রযোজকদের কার্য সীমাবদ্ধ নয়; প্রাত্যহিক উৎপাদন জনিত সমস্তরকম সমস্যার সমাধান করাই এদের কাজ। উৎপাদনে দাবীকৃত সমস্ত সরঞ্জাম সরবরাহ; প্রয়োজন হলে অপ্রত্যাশিত শিডিউলিং পরিবর্তন থেকে ক্র এবং প্রযোজকের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনের কাজ ও করে থাকেন লাইন প্রডিউসার।

একনজরে একজন দক্ষ লাইন প্রডিউসারের যে সমস্ত গুনগুলো থাকা দরকার, তা হল ফিল্ম বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মুখ্য প্রডিউসারদের কাছথেকে আদায় করার ক্ষমতা। মানুষকে প্ররোচিত করার ব্যাপারে দক্ষ হওয়া। প্রডাকশন বাজেট তৈরি ও কন্ট্রোল করার ক্ষমতা রাখা। দুর্দান্ত যোগাযোগের নৈপুন্যতা অর্জন করা। পুরো টিমকে মোটিভেট করার মতো মনোবল সম্পন্ন হওয়া। চরম পেশাদারী দ্রুত কাজ করিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখা। আইনগত ব্যাপার স্যাপার সম্পর্কে জানা এবং কাজের সময় সবার নিরাপত্তা ব্যাপারে সুনিশ্চিত করা। নেগোশিয়েশন বা আপোষ মীমাংসা করার ক্ষমতা রাখা। দ্রুত সিদ্ধান্ত তৈরির ক্ষমতা ডেভেলপ করা। এরজন্য ফিল্মের পুর প্রসেসটা হাতের তালুর মতো জানা দরকার। কূটনৈতিক চালেও দক্ষ হওয়া দরকার। সর্বোপরি খুবই কর্ম শক্তিসম্পন্ন এবং উদ্যমী হওয়া দরকার।

হলিউড বা বলিউডে কিহয় বলতে পারবোনা; আমাদের এখানে লাইন প্রডিউসার মানেই প্রযোজকের খুব কাছের লোক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কর্পোরেট বাবুরা তাদের পেয়ারের লোককেই এ কাজে নিযুক্ত করেন। এর জন্য প্রয়োজনও হয় না কোন গ্রিল্ড স্বীকৃতি। এর ফলে দক্ষ অদক্ষ দুই প্রকারের লোকই ঢুকে পড়ছে এই পেশায় ।

লাইন প্রডিউসার কেবল চলচ্চিত্রের উৎপাদন কাজেই নিযুক্ত থাকে না। মার্কেটিং, প্রচার, দৃশ্যমানতা এবং রিলিজ পর্যন্ত থাকে লাইন প্রযোজকের ভূমিকা।

শুধু টলিউডে নয় হলিউডে ও বলিউডের ছবিতেও এখন কোলকাতার লাইন প্রডিউসারদের দক্ষতার সাথে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। ফলে বাংলার বাইরের প্রযোজকেরাও কোলকাতায় কাজ করতে আসছেন উৎসাহের সাথে এর ফলে ফিল্ম শিল্পের সাথে যুক্ত বাংলার শিল্পী ও কলাকুশলী দের কর্ম সংস্থান বাড়ছে।

সাধারণত সহকারী পরিচালক ও ইউনিট প্রডাকশন ম্যানেজার থেকে লাইন প্রডিউসাররা আসেন। যাদের সময়ের ব্যবস্থাপনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ কার্যের উপযুক্ত উপাদান সরবরাহ সম্পর্কে সঠিক ধারনা থাকে। অঞ্জ লোক কখনোই এ কাজের উপযুক্ত নয়। তবে ফ্লিম স্কুলের ডিগ্রি না হলেও চলে।

বাংলা চলচ্চিত্রে লাইন প্রডিউসারের আগমন প্রডাকশন ম্যানেজারের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। ম্যানেজারের সম্মান দাঁড়িয়েছে তলানিতে। টালিগঞ্জ পাড়ায় লাইন প্রডিউসারদের কাজকর্ম প্রডাকশন ম্যানেজার দের মতো হলেও প্রযুক্তি ও একাধিক ভাষার দক্ষতা প্রডাকশন ম্যানেজারদের থেকে তাদের অনেকটা উচ্চতায় এগিয়ে দিয়েছে। কর্পোরেট মুখি বাংলা ছবির বাজারে। পজিশন ওয়াইজ লাইন প্রডিউসার দের উপরে রাখা হচ্ছে; বড় বাজেটের ফিল্মের ক্ষেত্রে লাইন প্রডিউসারের আন্ডারে কাজ করছেন এক বা একাধিক প্রডাকশন ম্যানেজার।

বলা খুব কঠিন কর্ম দক্ষতায় প্রডাকশন ম্যানেজারদের তুলনায় লাইন প্রডিউসারেরা বাংলায় এগিয়ে কিনা ! কারণ;প্রডাকশন ম্যানেজারের সংস্কৃতি অনেক প্রাচীন বাংলা সিনেমায়। কখনো কখনো পুরুষানুক্রমে এই পেশায় যুক্ত থেকেছেন বেস কিছু লোক। ফলে ফিল্ম নির্মাণের আটঘাট তাদের নোখ দর্পণে। সেখানে তরুণ প্রজন্মের যারা লাইন প্রডিউসার হয়ে আসছেন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতেই লেগে যাবে বেশ কিছুটা সময়। আর এই পেশায় অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বড় মূলধন ; এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

সেদিন হয়তো বেশি দূরে নেই; যেদিন প্রডাকশন ম্যানেজারের পদটাই পুরপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। থেকে যাবে অব্যাপ্ত সেই আট পৌড়ে মানুষ গুলোকে নিয়ে বাংলা সিনেমার টেকনিশিয়ানদের নস্টালজিয়া; প্রচুর টাকা লগ্নি হবে। কর্পোরেট চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করবেন বাংলা চলচ্চিত্রের বাজারে। সুবিধা মতো পুঁজি উৎপন্ন করবে অনেক পজিশন বিলুপ্ত করবে অনেক পথ। আসংখ্যার কথা যেটা স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ; “পথের পাঁচালী”র মতো আন্তর্জাতিক উন্নত বাংলা সিনেমা নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাবে। একছত্র ধনতান্ত্রিক পুঁজির হাতে বিষয় হীনতায় ভূগবে বাংলাচলচ্চিত্র। বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও সঙ্কট এবং সমকালীন বাংলা সমাজের শ্রেণিচেতনা স্থান পাবে না চলচ্চিত্রে। আপাত সম্মোহনে ডুবে থাকবে বাংলা ছবির আপামর দর্শক। সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের চৌহদ্দির মধ্যে আমল পাবেনা বস্তুত স্বাতন্ত্র্যবোধ ও মর্যাদাকে চেতনায় অভিষিক্ত করার মহান শিল্পরিতী। তবে পশ্চিমী চলচ্চিত্রে ডি সিকে, রুসলিনি, গদার ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েও ভোগবাদী ধনতান্ত্রিক সভ্যতার বিকল্প সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন স্থাপন করতে পারেনি। জা পল সার্ত্রে ও আলব্যের কামুর বিচ্ছিন্নতাবাদ ও অস্তিত্ববাদ দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছিল রেনে, রে-নোয়া, ফ্রাঁসোয়া, ক্রুফো, ডিসিকা, রসোলিনি, পাসোলিনি, ইঙ্গমার বার্গম্যান প্রমুখের ছবিতে। কিন্তু এই শূন্যতা বোধের উজ্জ্বল প্রতিফলনও এদেশের ছবিতে কোথায়।

তবে আশার কথা বাংলার মৃয়মান হয়ে পড়া চলচ্চিত্র শিল্প পুঁজির বিকাশে অক্সিজেন পাচ্ছে; নব প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনান্য ভাষা ভাসির চলচ্চিত্রর সাথে দৌড়ে পাল্লা-দিয়ে বাংলা ছবির মান উন্নয়ন ও বাজার বর্ধনের কাজ চলছে। বাংলা চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত মানুষের অন্নের সংস্থান বাড়ছে।

_________

তথ্য সূত্র:
১) সিনেমার শতবর্ষে ভারতীয় সিনেমা -প্রফুল্ল শুর
২) সিনেমা সংক্রান্ত -পুন্দ্রেু শেখর পত্রী
৩)The Economic Times-Corporates join Tollywood bandwagon, Bengali film budgets rise to about 5-6 times Tasmayee Laha Roy, ET Bureau Jan 2, 2014 .
৪) Wikipedia-Line producer;Literature History;History of Sculpture;History of Painting;Cinema of West Bengal .
৫) রূপের কল্পনির্ঝর: সিনেমা আধুনিকতা রবীন্দ্রনাথ- সোমেশ্বর ভৌমিক।
৬) আমার ব্লক কম: চলচ্চিত্র প্রযোজক হবার পথে।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...