বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সমীকরণ পালটে যাওয়ার ইঙ্গিত

পিনাকী ভট্টাচার্য। – রাজনিতক ও সামাজিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং জনপ্রিয় লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট।

263
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সমীকরণ পালটে যাওয়ার ইঙ্গিত

গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সমীকরণ পালটে যাওয়াটা দৃষ্টিগোচর হয়েছে অনেকের।  তা কীভাবে ঘটছে তার ব্যাখ্যার প্রথম অংশটা শুরু করি, বাংলাদেশের কাছে ভারতের প্রত্যাশা দিয়ে। আমরা প্রণবের সফরের সময়ে শুনেছি, ‘ট্র্যাক টু কূটনীতি’র কথা। সেই ‘ট্র্যাক টু’ আসলে বাংলাদেশের কাছে ভারতের আগামী দিনের চাওয়া কী কী সেটা ইনফর্মাল চ্যানেলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানোর তরিকার নাম। তাহলে ভারতের এখনকার চাওয়া কী বাংলাদেশের কাছে?

সোজা কথায় হচ্ছে, বাংলাদেশ চীনের সাথে কোন সম্পর্কে জড়াতে পারবে না। বাংলাদেশ বলে, ‘আরে, আমরা তো জড়াচ্ছি না, আমরা শুধু চীনের বিনিয়োগ নেব’। ইন্ডিয়া বলে, না তাও নিতে পারবা না। তো বাংলাদেশ বলে, তাইলে তুমি দিবা বিনিয়োগ? ভারত তখন আমতা আমতা করে বলে, না, ঠিক আমরা দিব না, দিবে আমরা চার দেশ মিলে যে সামরিক জোট করেছি সেইখান থেকে ব্যবস্থা করে দিব। কোন কোন দেশ? জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা আর ভারত। এরা কবে ফান্ড জোগাড় করবে তারপরে আমাদের এইখানে বিনিয়োগ করবে। কপাল আমার, হবে ছাওয়াল কইবে বাপ, তবে মিটবে মনের আশ।

আমাদের কি সেইটা দিয়ে চলবে? চলবে না। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনও কারণ নেই”। এখন নিশ্চয় মেলাতে পারছেন; কেন এই কথাটা বলা হয়েছিল। এখন কথা হচ্ছে, ভারত কি এটা মানবে? চীনের সাথে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সম্পর্ক থাকবে?

না, এটা ভারত কোনভাবেই মানবে না। এটাই ভারতের নন নেগোশিয়েবল চাওয়া বাংলাদেশের কাছে থেকে। এই চাওয়াকে কেউ পূরণ করতে পারবে না, এমনকি আওয়ামীলীগ সরকারও নয়। তবে আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ মনে করছে, তাঁদের প্রস্তাব মেনে নেয়া ছাড়া ভারতের কোন অপশন নাই। এইখানে একটা টেনশন তৈরি হয়েছে, সেটা কোথায় গিয়ে শেষ হয় – তাই এবার দেখার পালা।

এখনই পপ কর্ণ নিয়ে বসে যাইয়েন না। আরো আলাপ আছে। এইবার আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা লিসা কার্টিসের ইস্যুতে। তিনি এসেছিলেন তিনটা ইস্যু নিয়ে কথা বলতে। রোহিঙ্গা, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ে আলাপ করতে। এখন এই তিনটা ইস্যু আলাদাভাবে বিবেচনা করলে হবে না, একসাথে বিবেচনা করতে হবে।

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমি লিখেছিলাম, পশ্চিমা বিশ্ব, আমেরিকার হাত ধরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইন্টারভেইন করবে। দেখেন লিসা কী বলছে?

তিনি বলছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভুতিশীল। আমরা রোহিঙ্গাদের সমস্যা জানি। কি অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে তারা আছে এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ওরা দেশে ফিরতে চায়। কিন্তু কিভাবে? নিরাপত্তা ছাড়া কিভাবে ফিরবে? সম্মানের বিষয়টিও দেখতে হবে।….. রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে যুক্ত্ররাস্ট্র”।

কীভাবে থাকবে? এবার আসেন লিসার তৃতীয় উদ্দেশ্য নিয়ে আলাপ করি। তাহলে সেটা পরিষ্কার হবে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলাপ করবেন। তিনি কার সাথে আলাপ করলেন? প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা (কার্যতঃ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী) জেনারেল তারিক সিদ্দিকির সাথে আলাপ করলেন। এর নিহিতার্থ একটাই হতে পারে, তা হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব মায়ানমারে মিলিটারি ইন্টারভেনশনের কথা ভাবছে। আর তাঁদের অপারেশনের লাঞ্চিং গ্রাউন্ড হবে বাংলাদেশ।
মিলিটারি ইন্টারভেনশনের জন্য যে দেশটাকে লাঞ্চিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, সেখানে লাগবে ব্যাপক জনসমর্থন; জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার। সেকারণেই এসেছে অংশগ্রহনমুলক নির্বাচনের কথা। আমেরিকা তার গ্রাউন্ড তৈরি করছে।

লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসমুক্ত একটা নির্বাচন দেখতে চায়। যে নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ থাকবে। দেশের প্রয়োজনে এটা নিশ্চিত করতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী কি এই কারণেই লিসার সাথে দেখা করেননি? দেখা হলেই কি এই প্রস্তাবে নিজেদের ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট করার ঝুঁকি নিতে হতো? যদিও লিসাকে শাসক দলের পক্ষে থেকে বার্তা দিতে ভুল হয়নি। তার ঢাকায় অবস্থাকালেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমেরিকানদের এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। অযথা আমাদেরকে উপদেশ দিতে আসবেন না।”

তাহলে বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়ালো? ২০১৪ এর নির্বাচন মার্কা একটা নির্বাচন করা আর সম্ভব নয়, আর ভারত এখন যা চাইছে তাও বাংলাদেশ দিতে পারছে না। তাই সামনের সময়টা যে ক্ষমতাসীনদের জন্য সংকটপুর্ণ, এটা এখন স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে তাঁদের প্রতিকুলে চলে যাচ্ছে!

ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদটা আপনারাও পড়ুন।

(ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদটা পড়তে বা শুনতে এই লেখার উপর ক্লিক করুন)

পিনাকী ভট্টাচার্য। – রাজনিতক ও সামাজিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং জনপ্রিয় লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...