ফ্লোরিডা হামলায় আইএসের দায় স্বীকার: ধর্মের কল বাতাসেই নড়ে | গোলাম সারোয়ার

1353
bdtruenews24.com

ইংরেজিতে একটি প্রবচন আছে, কোন কুকুরকে হত্যা করার আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নাম রটাও। বর্তমানে আমেরিকা এই প্রবচনের কৌশলটি কাজে লাগাচ্ছে অনবরত। ২০০৩ সালের ২০ মার্চ মার্কিন নেতৃত্বে যখন ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয় তখন যুক্তরাষ্ট্র তোতা পাখীর মত অনবরত বলতে থাকলো, ইরাকে মারনাস্ত্র আছে।

কিন্তু ইরাকে অন্যায় যুদ্ধটির পর পরিদর্শক দল কোন গণবিধ্বংসী অস্ত্র পায়নি সেখানে। সেই যুদ্ধে আগ্রাসি বাহিনী প্রায় দশ লক্ষ আদম সন্তানকে হত্যা করে। আজও ইরাক একটি ভয়ানক অগ্নিগর্ভ।

বর্তমান বিশ্বে কোন রাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলতে হলে বড় বড় দেশগুলো থেকে রটিয়ে দিলেই হলো, দেশটিতে প্রচণ্ড সন্ত্রাস, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই।

সাম্প্রতিক কালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বার বার বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। তারা প্রায়ই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহের উপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখছে। কিন্তু গত শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো শহরে একটি নাইট ক্লাবে বন্দুকধারীর গুলিতে ৫০ জন নিহত হওয়ার পর আমাদের মনে হচ্ছে তারা আমাদের দিকে যত বেশি খেয়াল রেখেছেন নিজেদের দিকে তত খেয়াল রাখার সময় পাননি। এই ঘটনায় আইএস দায় স্বীকার করেছে।

আমরা জানি, নরহত্যায় মানব জাতির ইতিহাসে আমেরিকার রেকর্ড সর্বোচ্চ। দেশটিতে যার যখন খুশি যাকে খুশি গুলি চালিয়ে ফেলে দেওয়া যায়। হাজার হাজার স্কুল-কলেজের নিষ্পাপ ছেলেমেয়েকে দিনদুপুরে হত্যা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতিবছর আমেরিকাতে গোটা পঞ্চাশেক স্কুলে হামলা করে বন্দুকধারীরা। কিন্তু তাদের ইমেজ হলো, তারা নাকি নিরাপদ রাষ্ট্র। আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড হওয়ার কথা জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তরা নিরাপত্তার জন্যে যান আমেরিকাতে।

কোন রাষ্ট্রেরই পুলিশ অতিমানব নয়। অশরীরী কোন ত্রিকালদর্শীও নয়। তাদেরকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সময় দিতে হবে। তাদের কিছু পদ্ধতি আছে। সে পদ্ধতি সবক্ষেত্রে কাজ নাও দিতে পারে। পুলিশ অবশ্যই চেষ্টা করবে। কিন্তু পুলিশ যদি সবই পারতো তবে তো পৃথিবীতে কোন খুনই হতো না। নিছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে থেকেও বহুদেশের রাষ্ট্রপ্রধান খুন হয়ে যান।

এটা সত্য যে গত তিন বছরে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৪৯ জঙ্গী হামলায় ৫২ জনকে হত্যা করেছে জঙ্গীরা। কিন্তু যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে জঙ্গী দমনে সাহায্য করতে চায় তার অবস্থা যে অারো কত নাজুক তা ফ্লোরিডা হামলার পর মানুষ বুঝে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র হলো সেই দেশ যেখানে প্রতি তিন ঘন্টায় একজন করে আদম সন্তান খুন হয়!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এর পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর গড়ে ৩৩ হাজার আমেরিকান বন্দুক সন্ত্রাসে মারা যায়। আহত হয় ৮০ হাজার। গত ৪৪ বছরে (১৯৬৮-২০১১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ১৭১ নাগরিক বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রেরই জরিপকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের প্রতিবেদন মতে, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রশ্নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম। এই অবস্থান অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ফ্রান্স ও ভারতের চেয়েও ভালো। ‘বৈশ্বিক আইনশৃঙ্খলা সূচক-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর। জরিপে সবার ওপরে সিঙ্গাপুর। তাদের স্কোর ৮৯। তালিকায় ৩০ নম্বরে থাকা বাংলাদেশের স্কোর ৭৮। এই মানের স্কোর জাপান ও নিউজিল্যান্ডেরও। ৩৮ নম্বরে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এবং ৩৯ নম্বরে থাকা অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ৭৭। ৪৪ নম্বরে থাকা ফ্রান্সের স্কোর ৭৫। ৬৩ নম্বরে থাকা ইতালির স্কোর ৭১ এবং ৭৭ নম্বরে থাকা ভারতের স্কোর ৬৭। তাহলে বাংলাদেশ কি এমন পানিতে পড়ে গেছে !

বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচক-২০১৫ অনুযায়ী ১৬২টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২৫ নম্বরে। ১ নম্বরে থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইরাকের, পাকিস্তান ৪ নম্বরে আর ভারত হলো ৬ নম্বরে। তার মানে আমাদের অবস্থা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে ভালো। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৩৫ নম্বরে থাকলেও ফ্লোরিডা হামলার পর বিশ্বের সাধারণ মানুষই ঠিক করবে বাংলাদেশের অবস্থান তাদের থেকে ভালো না খারাপ।

বাংলাদেশে মানুষ আছে প্রায় সাড়ে ষোল কোটি। কিন্তু পুলিশের সংখ্যা মোটে ১,৪১,১২৩ জন। তার মানে প্রতি ১,১৭০ জন মানুষের বিপরীতে একজন মাত্র পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ২১৫ জনের বিপরীতে একজন পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। এবং তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। এই অবস্থায় এত ঘনবসতিপূর্ণ জটিল একটি দেশ আমাদের সরকারকে চালাতে হয়। এত কম সংখ্যক পুলিশ দিয়ে এত ঘনবসতির একটি দেশ চালানোর পরও আমাদের ফ্লোরিডার মত ঘটনা না ঘটা নিশ্চয়ই বিধাতার অসীম দয়া।

তবুও বলি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা ইদানিং অনেকটা অঘটন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে। এই অবস্থায় আমাদেরকে রাজনৈতিক, সামজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে ষড়যন্ত্রীদের মোকাবেলা করতে হবে। বিরোধী দলের দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই। তারা পাঁচ দুগুণে দশ বছর ক্ষমতায় ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা কি কি করেছে তা এই স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

আমরা জানি, বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্বার্থ। বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক বিচারে এক কৌশলগত অবস্থানে আছে। দেশটির অবস্থানই বিশ্বরাজনীতির আগ্রহের এক বিরাট কারণ। আমেরিকা যেহেতু অস্ত্রের, যুদ্ধের আর সৈন্যের ব্যবসা করে তাই তারা এমনস্থানে মনোযোগ দিবে যেখান থেকে তাদের লগ্নি উঠে আসবে দীর্ঘমেয়াদে।

বিশ্বরাজনীতিতে প্রতিটি দেশের কিছু হিসাব আছে। প্রতিটি রাষ্ট্রের ব্যাপারে চিন্তা করে ঐ রাষ্ট্রের জন্যে পররাষ্ট্রনীতির কৌশল নির্ধারন করতে হয় এক একটি রাষ্ট্রকে। এভাবেই ভারসাম্য রক্ষা হয়। বাংলাদেশের এখন যে অর্থনৈতিক অবস্থা এবং গতি তা জন্মের সময়ে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো মাথায় রাখেনি। মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরেই তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের উপর ওলটপালটের চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তাই কিছু কিছু রাষ্ট্র মরিয়া হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে।

এই অবস্থায় আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সমমতের রাষ্ট্রগুলোর সাথে বেশি বেশি যোগাযোগ রাখতে হবে। উন্নয়নকে টেকসই আর রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রাখতে হলে আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবশ্যই উন্নতি করতে হবে। অপরাধীদের যে কোন মূল্যে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে আরও বেশি সক্ষম এবং তৎপর হতে হবে। সমাজে ইতিবাচক পরিস্থিতি ফেরাতে রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের দায়িত্ব আছে। রাজনীতি করার উদ্দেশ্য শুধু টেন্ডারের কাজ পাওয়া নয়। সমাজের ভিতরে অনেক পক্ষ কাজ করে। সেসব প্রতিহত করতে হবে সমাজে জাগরনের মাধ্যমে।

এমপি মন্ত্রীরা এখন এলাকায় আসেন না। প্রতিটি এমপি ঢাকাকে মক্কা, মদিনা আর কাশি গয়া জ্ঞান করে বসে আছেন। এই ফাঁকে রাষ্ট্রের পরতে পরতে শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। এই শূন্যস্থানে শয়তান দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।যখন আইনসভা চলেনা তখন এমপিরা মাঝে মাঝে এলাকায় আসতে পারেন। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার ছাত্রদের সাথে সভা সমাবেশ করলে তারা আশাবাদী হবে। রাষ্ট্রের দর্শন, রাজনীতির দর্শন, ধর্মের সুন্দর দিকগুলো জাতীয় পর্যায়ের নেতারা যখন কোমলমতি ছেলেমেয়েদের বলবেন, তখন সমাজে আলোর ফুলকি ঝরবে। সেই ফুলকি থেকে আলোর বান আসবে।

প্রতিটি দেশের অন্তর্নিহিত শক্তি তার জনগণ। জনগণ যদি বিভ্রান্ত হয় তবে রাষ্ট্র যত ভালো কাজই করুক একদিন বিপাকে পড়বে। আজ রাষ্ট্র উন্নয়নের মহাসড়কে। কিন্তু সমাজে চলছে মিথ্যা প্রচারণা আর গুজব। নিরবে আর গোপনে তা বাড়ছে। এই অবস্থা প্রতিহত করতে হবে। না হলে সামনে ঘোর সঙ্কট।

লেখক: কলামিস্ট


মুক্ত মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। shompadak.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে shompadak.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...