প্রান্তিক জন: একজন মধুশীল বৃত্তান্ত

333
bdtruenews24.com

আতিকুর রহমান হিমু

প্রমিত বাংলায় নরসুন্দর। চলিত বাংলায় যারা ক্ষৌরকার্য করেন তাদের বলা হয় নাপিত বা শীল। নাপিত বা শীল সম্প্রদায় আবার দুই ভাগে বিভক্ত, মুক্তশীল আর ভ্রষ্টশীল। প্রাচীন কালে যারা উচু শ্রেণির লোকদের ক্ষৌরকার্য করতেন তাদের বলা হত মুক্তশীল, যারা নিচু শ্রেণির ক্ষৌরকার্য করতেন তাদের বলা হত ভ্রষ্টশীল। আর বৈষ্ণব মতবাদে বিশ্বাসী শীলদের বৈষ্ণবরা ডাকতেন মধু নামে। তাদের বিশ্বাস ছিল কোন এক মধু নামের বৈষ্ণব চৈতন্যদেবের ক্ষৌরকার্য করেছেন এবং বৈষ্ণব শীলরা তার উত্তরসূরি। উল্লেখ্য বৈষ্ণব নাপিতরা জাত ধর্ম নির্বিশেষে সবার ক্ষৌরকার্য করতেন।

আমাদের আলোচ্য মধুশীল চৈতন্য দেবের ক্ষৌরকর্ম করেননি বা বৈষ্ণব মতাবাদের লোক ও নয়। সে রাস্তার পাশে বসে ক্ষৌরকর্ম করেন। আর তার খদ্দের হল নি¤œবৃত্ত লোকেরা, যারা অর্থের অভাবে সেলুনের শোফায় বসতে সাহস করে না।

মধুশীলের জন্ম বাকেরগঞ্জের বুলিয়া, পিতা মৃত কালাচান শীল, মায়ের নাম মনে নেই; বয়সের হিসাবও রাখেনি মধু। কত হবে বয়স ৭৫ থেকে ৮০?

শৈশবেই বাবা হাতে-কলমে ক্ষৌরকর্ম শিখান মধুকে, তারপর থেকে এই পেশায় দীর্ঘদিন। প্রথমে বুলিয়া (বাকেরগঞ্জ, বরিশাল)। গত ৩৫ থেকে ৪০ বছর বরিশাল মেহেন্দিগঞ্জের পাতারহাট রসিক চন্দ্র কলেজের সামনে রাস্তায় বসে কাজ করেন। লুঙ্গির কোঁচায় পেচানো তার সরঞ্জাম- ১টা কাঁচি, ১টা ক্ষৌর ২/৩টা ব্লেড, একটু সাবান, ছোট একটা জলের বাটি এবং এক টুকরো ফিটকিরি। কাজ পেলে খদ্দেরকে বসিয়ে দেন পিড়িতে বা বড় কোন গাছের শেকড়ে। তারপর দুই হাটুর ভেতর মাথা চেপে প্রাচীন নিয়মে করেন ক্ষৌরকর্ম। একসময় প্রতিদিন আসলেও এখন সপ্তাহে দুই দিন (শুক্র ও মঙ্গল হাট বার) আসেন কলেজের সামনে। ভাগ্য ভালো হলে ২/৪ জন খদ্দের জোটে, আবার জোটেও না কোন কোন দিন। আয় খুব বেশি হলে ৬০ থেকে ৭০ টাকা (সপ্তাহে)। এভাবেই চলে মধুশীলের দিন।

কৈশরে বাবার ইচ্ছায় বিয়ে করে মধু (কালিগঞ্জে) ব্যক্তি জীবনে তিন কন্যা এক পুত্রের জনক। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই, একমাত্র ছেলে পাতারহাট বাজারে একটি সেলুনে কাজ করে।

অবিভক্ত ভারতবর্ষের মধুশীল উপনিবেশকাল, দুঃস্বপ্নের পাকিস্তান পেরিয়ে স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশেও মধুশীলই রয়ে গেছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে মানুষের করতলে মহাবিশ্ব। উন্নয়নের জোয়ার, আদার বেপারীও কর্পোরেট ভাগ্যের বদৌলতে জাহাজ কোম্পানির চেয়ারম্যান। রাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফিতি জাতীয় অর্থনীতি মধ্যম আয় পেরিয়ে উর্ধ্বগতিতে। বৃহৎ বাজেট বাস্তবায়নে গ্রামের আলপথে ঢুকে পরেছে পিচ ঢালা রাস্তা, সেই সাথে নেতা উপনেতার সবুজ ঝোপের ছোট বাড়িটায় আকাশ চুম্বি প্রাসাদ। কর্পোরেট উন্নয়নের বিপরীত দিক থেকে যায় মধুশীলরা, দিন দিন হারায় খদ্দের। রাষ্ট্রিয়, এনজিও, মানবাধিকার সংস্থার নানান রকম সাহায্য তহবিলের বিপরীতে বাড়তে থাকে মধুশীলদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা। আর একসময় জীবনের হিসাব মিলে মান্দার কাঠের সস্তা চিতায়, যোগফল ভেসে যায় ভুলগঙ্গাঁয়। আবার এদেরই কেউ পরিত্যক্ত কাফনের কাপড় পরে ভুল মাটিতে বাড়ার জৈবসার।

তথ্য সহোযোগীতায়: সাহিত্য পত্র ‘‘সকাল’’।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...