নির্বাচন সামনে রেখে জেলে বসে টার্গেট কিলিংয়ের ছক

নির্বাচন সামনে রেখে জেলে বসে টার্গেট কিলিংয়ের ছক

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নাশকতার ছক কষছে জঙ্গিরা। প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি তারা টার্গেট নির্ধারণ করছে। কারণ টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে তারা ফের আলোচনায় আসতে চায়। আর এ লক্ষ্যে তারা গোপনে নতুন সদস্য ও তহবিল সংগ্রহ করছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গিরা উত্তরাঞ্চলে সংগঠিত হচ্ছে। শুধু তাই নয় জেলে বসে এক জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে। নেতাদের কাছে চিঠি লিখে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগাতে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। গোয়েন্দারা ওই চিঠি উদ্ধার করেছেন।

জেল থেকে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘অ্যামিউনিশন সংগ্রহে এখনই তৎপর হওয়া দরকার। সামনে নির্বাচন। বিভিন্ন রকম সহিংসতা হবে। এ সুযোগ কাজে লাগানো দরকার।’ তাদের হিটলিস্টে রয়েছেন- আওয়ামী লীগ নেতা, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, প্রগতিশীল লেখক, চিন্তাবিদ, ব্লগার, সংখ্যালঘু নেতা এবং পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তা।

পুলিশ সদর দফতর এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের সংশ্লিষ্ট একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা  এসব তথ্য জানান।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার পুলিশের অতিরিক্ত আইজি ও এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে তারা কাজ করার সুযোগ পান না। এ কারণে ওই সময় জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যায় এবং তারা সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।

তিনি বলেন, সামনের নির্বাচনেও জঙ্গিরা তৎপরতা চালাতে পারে। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের পক্ষে জঙ্গি দমন ও প্রতিরোধে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে এবার নির্বাচনের সময় জঙ্গিদের নজরদারিতে রাখতে পুলিশের বিশেষ ইউনিট কাজ করবে। জঙ্গিদের ওপর নজর রাখতে এন্টি টেরোরিজম নামে পুলিশের একটি ইউনিট গঠন করা হয়েছে।

অতিরিক্ত আইজিপি শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, সামনের নির্বাচনে জঙ্গিরা যাতে কোনো ধরনের নাশকতা করতে না পারে সে জন্য ইতিমধ্যে আমরা আগাম তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি। জঙ্গিরা যে ছক কষছে, আমরা তার পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর থেকে আমরা জঙ্গি দমনে নিরলসভাবে কাজ করছি। আমাদের ক্রমাগত অভিযানে তাদের নেটওয়ার্ক তছনছ হয়ে গেছে। এখন যারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে তারা সফল হতে পারবে না।

পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানায়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), নিউ জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ ও হিজবুত তাহরিরসহ নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো এক ছাতার নিচে আসার চেষ্টা করছে। রাজশাহী, গাইবান্ধা, বগুড়া, নাটোরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গম চরে তারা জড়ো হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের বরাত দিয়ে পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানায়, নির্বাচনকালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ওই সময় কোনো ঘটনা ঘটলে রাজনৈতিক নেতারা স্বাভাবিকভাবে প্রতিপক্ষের ওপর দায় চাপাবে। তখন জঙ্গিরা অনেকটা আড়ালে থাকবে। তারা এ সুযোগটা কাজে লাগাতে চায়।

১৯ মার্চ বগুড়া থেকে তিন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের একজনের নাম আবির। শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি নেতাদের উদ্দেশে জেলে বসে এক জঙ্গির লেখা পাঁচ পৃষ্ঠার দুটি চিঠি আবিরের কাছে পাওয়া গেছে। চিঠি দুটি জেএমবির আমীর সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে দাদা ভাইয়ের উদ্দেশে লেখা। কিন্তু চিঠিটি তার হাতে পৌঁছার আগেই পুলিশ তা উদ্ধার করে।

পুলিশ জানায়, ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। ওই তিন জঙ্গির একজন হলেন সালেহীন। তিনি এখন ভারতে পালিয়ে আছেন। সেখান থেকে পুরনো জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। পালিয়ে থাকা আরেক জঙ্গি জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান জামাআ’তুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া (জেএমআই) নামে সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

সূত্র জানায়, গুলশানে হামলার পর প্রকাশ্যে আসে আইএসপন্থী জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি। এর আগে সবচেয়ে বেশি টার্গেট কিলিং ঘটিয়েছে আল কায়দাপন্থী আনসার আল ইসলাম। এ দুটি সংগঠন দেশে টার্গেট কিলিংয়ে যুক্ত। তবে জেএমবির পুরনো অংশটিও ভিন্ন মতাবলম্বীদের টার্গেট করে হত্যা করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি (ইনটেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, টার্গেট কিলিং ঠেকানো বেশ কঠিন বিষয়। বিশ্বের কোনো দেশই টার্গেট কিলিং ঠেকাতে পারেনি। এরপরও টার্গেট কিলিংসহ জঙ্গি তৎপরতা রোধে বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা বেশ তৎপর। জঙ্গি তৎপরতা বিষয়ে সতর্ক করে পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোয় সদর দফতরের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মৌখিক নির্দেশনাও দেয়া হচ্ছে।

নির্বাচন সামনে রেখে জঙ্গিরা যাতে তৎপর হতে না পারে সে বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান বলেন, নতুনভাবে জঙ্গি সদস্য রিক্রুট হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে কঠোর মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যারা জামিন পাচ্ছে তাদের নজরদারির মধ্যে রাখতে বলা হয়েছে। যাদের মাধ্যমে জঙ্গিরা জামিন পাচ্ছে তাদেরও তদারকির আওতায় আনতে বলা হয়েছে। প্রসিকিউশন ও অ্যাডভোকেটদের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মামলাগুলো সব সময় মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ভূমিকা বেশি রয়েছে উল্লেখ করে মনিরুজ্জামান বলেন, বগুড়া, রাজশাহী, গাইবান্ধা, শেরপুর, রংপুর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ কয়েকটি জেলায় নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...