দীলতাজ রহমান-এর কিশোর গল্প | ছোটন

178
bdtruenews24.com

অনেকদিন পর লন্ডন থেকে এসেছে ছোটনরা। এবার তোড়জোড় চলছে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার। গ্রামে যাওয়ার কথা শুনেই ছোটন খুব খুশি। কারণ গ্রামে গেলে দাদা-দাদুর সঙ্গে আবার দেখা হবে। ঢাকার পান্থপথে ছোটনদের নিজেদের ফ্ল্যাট আছে। ওরা লন্ডন থেকে আসার দুদিন আগে দাদা-দাদু গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। বাসার সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখে তাদেরকে বিমানবন্দর থেকে রিসিভও করেছেন। তারপর ওরা গুছিয়ে বসলে, দাদা-দাদু গ্রামে ফিরে গেছেন। কারণ গ্রামে তাদের বিরাট সংসার। দাদা-দাদু না থাকলে সামলাবে কে? ওদের ছোট চাচা, ছোট চাচি দুজনই ইঞ্জিনিয়ার। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালান। থাকেন বনানীতে। কিন্তু ওদের ছোট্ট মেয়ে রুমুকে চাচি প্রতিদিনই পাঠিয়ে দিচ্ছেন ছোটন, বড়’র সঙ্গে খেলা করতে। ওদের মা ডা. পারমিতা তো রুমুকে পেলে ছাড়তেই চান না। শেষে কোনো কোনো রাতে চাচা, চাচিও থেকে যান ছোটনদের বাসায়।

ছোটনের খুব মনে পড়ছে গ্রামে তার চাচাতো, ফুফাতো, আরও সম্পর্কের অনেক ভাইবোনদের কথা। অনেকদিন পর সে দেখতে পারবে তাদের। কতদিন গ্রামে যাওয়া হয় না।

ছোটনের আসল নাম তূর্য। ওরা দু’ভাই। দেখতে ঠিক যমজের মতো এবং দু’জনই খুব সুন্দর। তাই দাদা আদর করে তূর্যকে ছোটন আর ছোটনের বড় ভাই তুহিনকে বড় বলে ডাকেন। এভাবে ডাকতেই নাকি দাদার বেশি ভালোলাগে। তাই ওদের মা-বাবাও প্রায়ই ওই নামে দু’ছেলেকে ডাকেন।

তূর্যরা আজ গ্রামে যাচ্ছে, কী মজা! ওদের সঙ্গে ছোট চাচা, চাচিও যাচ্ছেন। রুমু তো আগের রাত থেকে ওদের বাড়িতে। কারণ রুমু ভয় পাচ্ছিলো, শেষে কিনা ওকে রেখে যায়। কারণ চাচি বলেছিলেন, ‘তুমি খুব দুষ্টামি করো, তোমাকে নেয়া হবে না।’ তূর্য, তুহিনের বড় মামার গাড়িটি নিয়ে যাচ্ছে ওরা। ওরা গ্রামে যাওয়ার সময় প্রতিবারই আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও আশেপাশের গরিব প্রতিবেশীদের জন্যও কাপড়চোপড়, খাবার নিয়ে যান মা। এবার আরও বেশি করে নিচ্ছেন। এবার প্রতিবেশীদের জন্য আরো আছে বিদেশি চকলেট, সাবান। রংপেনসিল। আরও কত্তো কি…।

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল মাত্র দু-আড়াই ঘণ্টার রাস্তা। যেতে পথে কোনো অসুবিধা হয় নি। বরং গাড়ি থামিয়ে মিষ্টি কিনতে নেমে মজাই হয়েছে। দই না রসমালাই বেশি ভালো, দু’ভাই অনেকখানি করে টেস্ট করতে পরেছে। আর রুমু দু’জনের কাছে গিয়ে আবদার শুরু করেছে মিষ্টি খাওয়ার জন্য। বড় বলেছে, আপু তুমি কোনটা খাবে, সে-ভাঙা ভাঙা শব্দে বলেছে, ‘ছব মিষ্টি কাবো।’ রুমুর কথায় সবাই হেসেছে।

অনেক রকম মিষ্টি কেনা হলে গাড়ি যখন ছাড়লো, অল্পক্ষণের মধ্যে একেবারে ঘরের সামনে গিয়ে থামলো গাড়ি। ওরা নামার আগেই আশেপাশের বাড়ির সবাই এসে এমনভাবে ঘিরে দাঁড়ালো, যে গাড়ি থেকে ওদের নামাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠলো। শেষে ছোটনের দাদা ভাই এসে সবাইকে সরিয়ে ওদেরকে উদ্ধার করলো। রাখাল খুব আনন্দের সাথে মিষ্টির প্যাকেটগুলো কাঁধে করে ঘরে নিলো। ঘরেও সে কী ভীড়! এতো মজার মজার রান্না, কিন্তু মানুষের ভীড়ে কোনোরকম করে ওদের খেতে হলো। কারণ সবাই তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। এতো মানুষের ভীড় দেখে রুমু বোধহয় ভয় পাচ্ছে, শেষে কি-না ও হারিয়ে যায়। কারণ সবাই ওকে কোলে নেয়ার জন্য কাড়াকাড়ি করছে।

খাওয়ার শেষে ছোটনের মা ডা. পারমিতা ড্রাইভারকে হুকুম দিলেন গাড়ি থেকে লাগেজগুলো নামিয়ে ঘরে আনতে। ডা. পরমিতা সবকিছু শাশুড়ির হাতে বুঝিয়ে দিয়ে, বাইরের মানুষের জন্য আনা জিনিসপত্র সব নিজে নাম ডেকে ডেকে বিতরণ করলেন। একেবারে সন্ধ্যার অন্ধকার এসে হামলে পড়েছে উঠোনে। তবু কে কতো ভালোটা পেলো, নিজেরা নিজেরা যাচাই করতে করতে মানুষে গমগম করছে বাড়ি। কেউ কেউ গিয়ে আবার ফিরেও আসছে। নতুন করে আসছে ছোটনের দাদুর অন্যসব ভাইয়েরা, বন্ধুরা। কারণ ছোটনের মা খুব ভালো কফি বানাতে পারেন। চা-ও খুব যতœ করে বানান। তাই সবাই আসছেন ছোটনের মায়ের হাতের চা-কফি খেতে। একেবারে গরীব বুড়ো যারা, ছোটনের মা তাদের সবাইকে আলাদা বসিয়ে চা নাস্তা খাওয়াচ্ছেন। ছোট অচেনা গরীব ছেলেমেয়েদের মুঠো ভরে চকলেট দিচ্ছেন। মিষ্টি দিচ্ছেন। ছোটনের খুব আনন্দ লাগছে। সে তার ভাই তুহিনের হাত ধরে কেবল অবাক চোখে দেখছে। কোত্থেকে ওদের বাবা ডা. রাকিব এসে বললেন, দেখেছো, এরা অল্প কিছুতেও কতো তুষ্ট? বড় হয়ে যখন তোমরা তোমাদের মতো করে আসবে, তখনও এদের জন্য আলাদাভাবে কিছু আনবে।

সেই যে কবে এসে ক’দিন থেকেছিলো ছোটন, বড়, তখন পাড়াপড়শি ছেলেমেয়ে যাদের সাথে পরিচয় হয়েছিলো, যাদের সাথে খেলতো, তারা কেমন অচেনা হয়ে গেছে। চিনতে পেরেও কেউ আর ডেকে কথা বলছে না। ওরা দু’ভাইও কাউকে ডাকতে পারছে না। বড় মানে তুহিন একটু লাজুক স্বভাবের। বাবা-মা বলেন, ‘বড়টা ছোটনের মতো সাহসী নয়, একটু ভীতু’। সত্যি ছোটন বরাবরই চটপটে। বাসায় অতিথি এলে বড় ওর নিজের ঘর থেকে বেরোতে চায় না। আর ছোটন ছোটবেলা থেকে সবার সঙ্গে আগবাড়িয়ে আলাপ তো করেই, খুব ছোটবেলায় সে নাকি অতিথির কোল থেকে নামতেই চাইতে না। আর এই গল্প যখন বড় সবাইকে বলে, তখনও ছোটন অতিথির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকেও বলে, মিথ্যে কথা! মিথ্যে কথা!! ভাইয়াটা মিথ্যে কথা বলছে!

অনেকদিনের অদেখার দূরত্ব ঘুচিয়ে অবশেষে সন্ধ্যার আঁধার গাঢ়ো হওয়ার আগেই ছোটন, বড় ধীরে ধীরে মিলে গেলো ওদের বিশাল বড় বাড়িটির অনেকগুলো ছেলেমেয়ের সঙ্গে। বড় ছোটনকে বোঝাচ্ছে, তুই আর আমি যেমন দুই ভাই, তেমনি আমাদের দাদারা ছিলেন সাত ভাই। আবার তাদের বোনও ছিলো তিনজন। এই বাড়ির সব চাচা আমাদের আব্বুর চাচাতো ভাই। তাই এরা সবাই আমাদেরও চাচাতো ভাইবোন, কী মজা, তাই না রে ছোটন?

হ্যাঁ, ঢাকাতে সবাই আমাদের বন্ধু, কেউ ভাইবোন না, রুমুটা আমাদের সমান হলে খুব মজা হতো, তাই না?
‘হ্যাঁ’ বড় সায় দেয়।
‘লন্ডনেও তো সবাই আমাদের বন্ধু, তাই না?’
‘হ্যাঁ’ বড় আবারও সায় দেয়।
উঠোনের কোনায় বিরাট খড়ের পালা। ওরা গল্প করছিলো সেখানে দাঁড়িয়ে। লিজা চেঁচিয়ে বললো, এই চলো আমরা অন্য কোথাও গিয়ে গল্প করি। এখানে সাপ থাকতে পারে। সবাই লিজার কথায় ভয় পেয়ে রাজি হয় সরে যেতে। নূরু ছোটন, বড়র আরেক চাচার ছেলে। সে বললো, আজ চাঁদটা অনেক বড়। অনেকক্ষণ আলো থাকবে। আজ আমরা কেউ ঘুমাবো না। জেগে থাকবো। সবাই একটা করে গল্প বলবো!
কিন্তু ছোটন, বড়’র মা এসে ওদের ঘরে নিয়ে যেতে চাইলেন।
ততোক্ষণে সবার জড়তা কেটে গেছে। সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো, না চাচি, আমরা আজ সারারাত সবাই একসঙ্গে থেকে গল্প করবো!
কিন্তু ডা. পারমিতা বললেন, কুয়াশা পড়ছে, তোমাদের সবার ঠাণ্ডা লাগবে। তোমরা গল্প করতে চাইলে করো। কিন্তু ঘরে গিয়ে। আর বাইরে থাকা চলবে না। অসুখ হলে, বেড়ানোর আনন্দ নষ্ট হয়ে যাবে। তা ছাড়া আমাদের কালই সন্ধ্যায় ফিরতে হবে।
কেউ-কেউ বলে উঠলো, তা-ই হবে, আমরা ঘরেই গল্প করবো! তখন কেউ বললো, ‘কার ঘরে যাবো সবাই?’ দোনামনা শুরু হয়ে যায় সবার। ‘তাই তো, এতোগুলো ছেলেমেয়ের কার ঘরে বসে গল্প হবে?’
ডা. পারমিতা ওদের সঙ্কট টের পেলেন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি, তোমরা সবাই তোমাদের মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এসো এবং সবাই সোয়েটার পরে এসো।’
গ্রাম হলেও ছোটনদের একতলা বড় বিল্ডিং। বসার রুমটিও বেশ বড়সড়। এর বাইরের সিঁড়িতে বসেও কতো সালিশ দরবার হয়। ডা. পারমিতা সোফাগুলো সব দেয়ালের দিকে ঠেলে রাখালকে বললেন মেঝে পরিষ্কার করে মুছে দিতে। দুটো তোশক সে-ই এনে পাশাপাশি বিছিয়ে দিলো। ডা. পারমিতা এলেন নতুন চাদর, আর নতুন ওয়ার লাগানো ক’টা বালিশ নিয়ে। তিনি ছেলেমেয়েদের বললেন, এই চাদর তোমরা বিছিয়ে নাও। আর এই নাও কয়েকটা বালিশ। এগুলো থাক এখানে। কারো যদি ঘুম এসে যায়, সে শুয়ে পড়বে। শীত তো ততো বেশি নয়। কয়েকটা চাদর রইলো, গায়ে দিতে। সারারাত ঘরে দুটো টিউব লাইট জ¦লবে, তোমাদের ভয়ের কারণ নেই।’
রাখাল এ-বাড়ির চারটি গোরু আর দু’টি বাছুরের প্রতিপালনের দায়িত্বে আছে। বয়স বিশ-বাইশের মতো। সে একটু হাবাগোবা ধরনের। তাই ওকে কেউ নাম ধরে ডাকে না। সবাই রাখালই বলে। সারারাত লাইট জ¦লবে শুনে রাখাল বললো, বড় আম্মা, লাইট কিন্তুক অর্ধেক রাইত জ¦লবো।
ডা. পারমিতা একটু চমকালেন যেনো। বললেন, কেন?
‘একঘণ্টা পর আসে, একঘণ্টা পর যায়।
হাসলেন পারমিতা। বললেন, ও এই কথা! সে তো ঢাকা শহরেও যায় রে! তুই যা, ঘরে ক’টা চার্জলাইট আছে এনে এদের কাছে রেখে যা!
‘বড় আম্মা, লন্ডনে বিদ্যুৎ যায় না?’
‘রাখাল লন্ডনের খবর পরে শুনবি, আগে চার্জলাইট আন!’
‘বড় আম্মা, আমি আইজ এই ঘরে, এগো লগে বইসা লন্ডনি গল্প শুনবো।’
‘তুই বসে থাকবি কী? তোর সকাল থেকে কতো কাজ, না ঘুমালে কাজ করতে পারবি? কাল কত মানুষ আসবে, তোর ছুটোছুটির কাজ কত বেড়ে যাবে, জানিস?’
‘না ঘুমাইয়াও কাজ করতে পারবো আম্মা, ভূতের ভয়ে কতো রাইতে ঘুমে ধরে না। পাটখড়ির বেড়ায় ভূতে আঙ্গুল দিয়া শব্দ করে। বেড়ার লগে পিঠ ঘষে, নাকি সুরে কথা কয়। কয়, তুই বাইর অইয়া আয়, তোরে রাজা বাদশা বানাইয়া দিমু, আমি খালি গোরুগুলার মায়ায় যাই না…!’
-একদম বাজে কথা বলে ছেলেমেয়েগুলোকে ভয় দেখাবি না!’ রাখালকে ধমক দেন ডা. পারমিতা।
‘আম্মা একবার গোয়াল ঘরে চোর আইছিলো। কিন্তু গোরু নিতে পারে নাই! তবু দাদাজান সেই যে আমারে গোয়ালঘরের এককোনায় বেড়া দিয়া একখান চৌকি পাইত্তা দিছে, সেইতন চোর বেডা আর না আইলেও, আমার আর ঘরে শোয়া অইলো না। আগে তো আমি এইখানে আমার কাঁথা বিছাইয়া শুইতাম।
রাখালের কথা শুনে ছোটন, বড় খুব মজা পেয়েছে। তারা তাদের মাকে রাজি করিয়ে ছেড়েছে, রাখালকে ওদের ঘরে রাখতে।
কিন্তু রাখালের সঙ্গে শর্ত হলো, রাখাল ওদের ভূতের গল্প শোনাবে।
ডা. পারমিতা পাশের ঘরে শুতে চলে গেলেন। কিন্তু এতোগুলো ছেলেমেয়ের হৈহুল্লোড় শুনে একে একে অনেকেই এসে দেখে গেলেন ওদের। ছোটন, বড়’র বাবা, দাদা, দাদু এবং অন্য ঘরের চাচা-চাচিরাও এসে উঁকি দিয়ে দেখে গেলেন তাদের। রুমুও এসে সবার মাঝখানে কতক্ষণ বসে থেকে ঘুমিয়ে পড়লো। পরে চাচি এসে তাকে নিয়ে গেছেন। ডা. পারমিতার আয়োজন দেখে খুশিই হলো সবাই। সবশেষে ওদের বাবা আবার এসে কয়েক প্যাকেট বিস্কুট দিয়ে গেলেন, বলে গেলেন, তোমরা এখানে পনেরোজন। অনেকক্ষণ গল্প করতে করতে তোমাদের খিদে লেগে যাবে।
‘আমার ভাগেরটা আমারে দিয়া দেন বড় ভাই, আমি যদি ঘুমাইয়া যাইগিয়া!’ রাখাল বললো।
‘যে ঘুমিয়ে যাবে, তার খেতে হবে না’, বলে ডা. রাকিব চলে গেলেন।
বাবা চলে যেতেই ছোটন চিৎকার করে উঠলো, ‘এই রাখাল কাকা, তোমার ঘুমালে চলবে না। ভূতের গল্প শোনাও!’
রাখাল হাই তুলতে তুলতে বললো, ‘আগে বাজান একটু লন্ডনের গল্প শোনাও। ওইখানে নাকি তুলার মতো বরফ পড়ে? মানুষগুলান সব সাদা, দুধের মতো ফকফইক্কা? টেলিভিশনে দেইখ্কা পরান ভরে না। তোমরা দুই ভাই কও’ পরান ভইরা শুনি!
তুমি ভূতের গল্প বলো, যে-ভূতটাকে তুমি ভয় পাও!’ ছোটন বলে।
‘যে-ভূতটা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না।” বড় বলে।
‘রাখাল কাকা, তুমি গল্প না বললে তোমাকে গোয়ালঘরে পাঠিয়ে দেবো।’ বলে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করতে থাকে।
রাখালকে গোয়ালঘরে পাঠাবে কী, সারাদিনের খাটাখাটুনির শরীর, সে ঘুমে কাত হয়ে পড়লে ছেলেমেয়েরা তার কাঁথা দিয়েই তাকে ঢেকে রাখে, শীত থেকে বাঁচাতে।
কিন্তু এখন আর গল্প জমছে না। ভূতের কথায় ছোটন, বড়’র মন চলে গেছে ভূতের বিষয়ে।
ঝিমধরা ভাব কাটাতে বাঁধন বলে উঠলো, আমরা কাল কী কী করবো, তার একটা পরিকল্পনা করি! রাখালকে এখানে রাখা ঠিক হয়নি। সব পরিকল্পনা ওলোটপালোট করে দিলো।
তমাল বললো, কাল আমরা ছিপ দিয়ে মাছ ধরবো।
‘কিন্তু বড়শি?’ বললো আবীর।
‘বড়শি তো সবারই আছে। যে-ক’টা কম পড়বে, আমরা দোকান থেকে কিনে সুতো পাকিয়ে কঞ্চি কেটে বেঁধে নেবো।’ মেহেদী বললো।
‘কিন্তু বল্লার ডিম?’ সাকিব বললো।
‘রাখাল কাকা বল্লার ডিম জোগাড় করে দেবে।’ আবীর, বাঁধন একসঙ্গে বললো।
‘আমাদের পুকুড়পাড়ে ঝোপের ভিতর বল্লার ওড়াউড়ি দেখেছি। কিন্তু আমরা ওটা একা পাড়তে পারবো না। রাখাল কাকা কাউকে নিয়ে পাড়বে।’ লিমা বললো।
‘এই বড়, তোমরা দুভাই সাঁতার জানো?’ লিজা বললো।
‘না কাল আমরা তোমাদের সঙ্গে সাঁতার শিখবো, গুড আইডিয়া!’ ছোটন বললো।
‘আমরা কিন্তু ঘুড়িও ওড়াবো। জাপানের ঘুড়ির মতো সুন্দর ঘুড়ি কিনতে পাওয়া যায় রবি কাকার দোকানে।’ পাপলু বললো।
‘নাটাই পাবে কোথায়?’ কিচলু বললো।
‘এই, এই, এই নাটাই আছে তোদের?’ সাম্য বললো।
‘না থাকুক, আমরা দু’টাকা করে চাঁদা তুলে ভালো একটা নাটাই কিনে নেবো!’ মেহেদী বললো।
‘আমরা অনেকগুলো ঘুড়ি, অনেকগুলো নাটাই কিনে সবাই একসঙ্গে ঘুড়ি ওড়াবো। না হলে তো একজন ওড়াবে সবাই তাকিয়ে থাকবে। কাটাকাটি খেলা হবে না!’ বড় বললো।
‘এতো টাকা পাবো কোথায়?’ তমাল বললো।
‘ছোট চাচাকে পটাবো। চাচা একটা একটা নাটাই- ঘুড়ি নিশ্চয় আমাদের সবাইকে কিনে দেবেন!’ ছোটন বললো।
‘তবে কাল প্রথম আমরা বরই কুড়াবো। ওই যে ওইদিকে আমাদের বাবাদের দাদার আমলের ভিটা…।’ তমাল বললো।
‘ভিটা আবার কী?’ বড় বললো।
‘ভিটা মানে বাড়ি তৈরির আগে যে জায়গা প্রস্তুত করা হয়।’ লিমা বললো।
‘তো আমাদের বাবাদের দাদার বাড়িটা আগে ওইখানে ছিলো। তোমরা দেখো ওখানে কয়েকটা ঘরের ভিটির চিহ্ন এখনও আছে।’ আবীর ওদের সবার চেয়ে বড়। সে একটু গম্ভীরস্বরে বললো।
‘ওই চিহ্নগুলো আমাকে আর ছোটনকে তোমরা চিনিয়ে দেবে। ওইখানে আমাদের দাদার বাবা থাকতেন?’ বড় বললো।
‘ভাবতে গেলে কেমন শিহরণ লাগে, না?’ সাকিব বললো।
‘বরই কুড়াতে কোথায় যাবো তা-ই বলো?’ ছোটন বললো।
‘হ্যাঁ, বাবাদের দাদার আমালের ওই ভিটায় অনেক ভালো ভালো গাছ আছে। কিন্তু একটা বরইগাছ আছে, বরই এতো মিষ্টি…! লিজা বললো।
‘কেন?’ ছোটন, বড় একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।
‘ওখানে ভূত আছে!’ আবীর বললো।
‘তা-ই! সত্যি ভূত, নাকি অনুমান?’ ছোটন, বড় আলোকিত হয়ে উঠলো আনন্দে।
আমরা সবাই পল্লাপাল্লি করেই যাই। তবে সূর্য ওঠার আগে কেউ যাই না।’ সবাই প্রায় একসঙ্গে বললো।
‘কখন গেলে ভূত দেখা যাবে তা-ই বলো, আমি ভূত দেখবো। বরই তোমরা নিও!’ ছোটন বললো।
‘আব্বু, আম্মু যেতে দেবেন না ভূতের কথা শুনলে!’ বড় বললো।
‘ভূতটা দেখতে কেমন?’ কৌতূহলী হয়ে ওঠে ছোটন।
‘রাখাল কাকাকে ডেকে তোলো তো, ও নিশ্চয় দেখেছে!’ বড় বললো।
‘হ্যাঁ, রাখাল কাকা তো প্রায়ই দ্যাখে। আমাদের ওই ভিটা নিয়ে বহু বছর মামলা হয়েছে। এই ভিটার একটা অংশ নাকি চৌধুরীদের। এইটা নিয়ে তো দাদার বাবার আমল থেকে ওদের সাথে আমাদের বিরোধ। কিন্তু দখল করতে যে আসবে, ওরা আমাদের সঙ্গে জনশক্তিতে পেরে ওঠে না…।’ আবীরকে থামিয়ে দিয়ে বড় প্রশ্ন করে, ‘শেষে কি হলো?’
‘চৌধুরীদের এক ছেলের বউকে নাকি জিনে ধরেছিলো। সেই বউটার বাচ্চা হওয়ার সময় জিনটা নাকি বউকে মেরে ফ্যালে। তখন মুক্তিযুদ্ধের সময়। গ্রামের মানুষ রাজাকার আর মিলিটারির ভয়ে পালিয়েছিলো। এই সুযোগে রাতের অন্ধকারে ওরা ক’জন কবর খুঁড়ে বউটাকে ওই ভিটায় দাফন করে।’ আবীর বললো।
‘চল্লিশ বছর ধরে সেই একই কথা। ওই ভিটার পাশ দিয়ে এখন যে বড় পাকা রাস্তা হয়েছে, তখন ওটা সরু রাস্তা ছিলো। তখন রাস্তার দুপাশে প্রচুর ঝোপঝাড় ছিলো। তো ওই রাস্তা দিয়ে রাতে যারা চলাচল করতো, তারা নাকি দেখেছে, রাতে ওই কবরের ওপর বউটা বসে গুনগুন করে কাঁদে। নাকিসুরে বলে, আমার বাচ্চাকে এনে দাও।’ তমাল বললো।
‘আর সেই বাচ্চা?’ ছোটন, বড় একসঙ্গে প্রশ্ন করে।
‘বাচ্চাটা তো এখন মস্ত বড় সাহিত্যিক। ছোটদের জন্য দারুণ সব ছড়া-গল্প লেখেন! কেন, আরমান চৌধুরীর নাম শোনোনি?’ আবীর বললো।
‘আমরা তো সবাই তাঁর ভক্ত!’ বাঁধন বললো।
‘তা হলে তো ওনার বইগুলো জোগাড় করে আবার পড়তে হবে।’ ছোটন বললো।
‘আমাদের গ্রামে একজন লেখক আছেন, এটা তো বড় গৌরবের! চলো, কাল একবার আমরা গিয়ে তাঁকে দেখে আসি!’ বড় বললো।
‘কী দেখতে যাবে, উনি কি আর বাড়িতে থাকেন নাকি? তবে মাঝে মাঝে আসেন।’ আবীর বললো।
‘আমাদের বাড়িতে একবার এসেছেন।’ বাঁধন বললো।
‘বেড়াতে?’ বড় বললো।
‘উনি নাকি দাদাভাইয়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।’ আবীর বললো।
‘কেন?’ ছোটন বললো।
‘বলেছেন, আমার মা’কে যদি আপনাদের জমিতে দাফন করা হয়ে থাকে, তা হলে যেন দাদাভাই তাঁর মাকে ক্ষমা করে দেন।’ তমাল বললো।
‘দেয়া উচিত, তাঁর মায়ের তো কোনো দোষ নেই। এমন কি তাঁরও না।’ হিমেল বললো।

রাখালের নাকডাকার শব্দে সবাই বিব্রত হলেও আনন্দও কম পাচ্ছিলো না। মাটিতে শুয়ে এমন হৈহল্লার ভেতর কেউ এমন হাপুস ঘুমোতে পারে, তা বড়, ছোটন ছাড়া আবীর, বাঁধন, তমাল, লিমা, লিজা, মেহেদী, সাকিব, নয়না, হিমেল, পাপলু, কিচলু, টিপু, সাম্য কেউ দেখেনি। অবাক হতে হতে ঘুম ওদের চোখেও জেঁকে আসে। পাতলা চাদর গায়ে, আর এক এক বালিশের চার কোনায় প্রায় চারজন করে মাথা রেখে কু-লী পাকিয়ে পাকিয়ে পড়ে আছে সবাই। ঘরের দুপাশে জ¦লছে দুটো টিউবলাইট। আবার চার্জলাইটও জ¦লছে। তার মানে বিদ্যুৎ গিয়ে আবার এসেছে, এরা কেউ টের পায়নি। প্রায় শেষরাতে ঘুম ভেঙে প্রতিরাতের অভ্যাসানুযায়ী ডা. পারমিতা ছেলেদের খোঁজ নিতে এসে সবার মুখে চোখ বুলোলেন। কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সবার মুখ প্রশান্তির রেশ ছড়াচ্ছে। তিনি চার্জলাইট দুটো তুলে নিতে গিয়ে আবার তাকালেন সবার মুখে। কিন্তু কে যেন নেই এখানে! অ্যাটাচড বাথ। তারও দরজা খোলা। বাইরের দরজার দিকে চোখ রাখতে দেখলেন হুড়কো খোলা। নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠলেন। তূর্য! তূর্য!!

আচমকা গগণবিদারী কান্নার শব্দ শুনে সব ঘরের সামনের, পিছনের বাতি একে-একে জ¦লে উঠলো। তার পরেও কারো হাতে টর্চলাইট, কারো হাতে চার্জলাইট। সবই খুঁজছে তূর্যকে। ক্রমে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ছে দূরের ঝোপঝাড়গুলোতে। অন্য ছেলেমেয়েগুলো সব ঘুম ভেঙে ভয়ে যেন জমে আছে। সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেউ নড়ছে না। কিন্তু রাখাল একাই ঘুমিয়ে কেন্নোর মতো গোল হয়ে আছে। এতো মানুষের চিৎকার চ্যাঁচামেচিতেও তার কু-লী ছুটছে না। কিন্তু আজান-এর সুর ভেসে আসতেই আপনাআপনি আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করলো সে।

নারী-পুরুষ সবাই ফিরে এসে গুটিয়ে পড়েছে বসার বড় রুমটিতে। যেখানে যেখানে খোঁজা প্রয়োজন, তার কোথাও কেউ বাকি রাখেনি। আজানের শব্দে রাখাল আর বিছানায় থাকতে পারে না। আজান পড়লে তার আর ভয়ও থাকে না। খারাপ জিন, ভূত যা থাকে তারা আজানের শব্দে দূরে চলে যায়, সে তা-ই জানে। তাই তার ভয়ও থাকে না। রাখাল জেগে উঠে যখন টের পেলো, ছোটনকে পাওয়া যাচ্ছে না, সে তখন সেই ভয়াবহ পতিত ভিটার দিকে দৌড়াতে থাকে। তার দৌড় দেখে কেউ-কেউ ওকে লক্ষ্য করে এগোতে থাকে।

চাঁদের আলো তখনও চেনা যাচ্ছে। আবার ফুটি ফুটি করছে ভোরের আলোও। ছোটনকে রাখাল দেখতে পেয়ে ছুটে চলে গেল তার কাছে। পূর্বপুরুষের ভিটায়। আরমান চৌধুরীর মায়ের ভাঙা কবরের পাশে। সে মৃদু পায়ে পায়চারি করছে সেখানে। যেখানে দুই পুরুষ আগের ঘর ছিলো, তার ভিত্তির ওপরও সে পায়চারি করছে। রাখালকে ছুটে আসতে দেখে ছোটন কিছুটা আঁতকে ওঠে। এবারই বরং সে ভয় পেয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, মা তাকে খুঁজছেন। মায়ের কথা মনে হতেই আলো-অন্ধকার, কুয়াশা ফুঁড়ে সে ক্ষিপ্র গতিতে বাড়ির দিকে ছোটে।

ডা. পারমিতা তূর্যকে ধরে কাঁদতে লাগলেন। দাদাভাই, দাদু, আব্বু সবাই এসে একসঙ্গে ছোটনকে টানাটানি করতে লাগলেন, ও কোথায় ছিলো জানতে।
বাড়ির ছোটরা কিন্তু এইমাত্র ঠিকই বুঝে গেছে, ছোটন ওই পতিত ভিটেয় গিয়েছিলো। সবার চোখ ক্রমশ ছানাবড়া হতে থাকে। রাখাল হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসে ঘরে ঢুকে বড় এক মগ পানিতে এক খাবলা লবণ গুলিয়ে খেতে খেতে ভীড়ে এসে দাঁড়ালো। তারপর সে ছোটনের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, চল্লিশটা বছর ধইরা বেডি কান্দে জামেলার জায়গায় মাডি দেওনে। কও বাজান, কেমুন দেখলা বেডিরে? পরনে কাপড়চোপড় আছিলো? নাকি…।
‘থাম্, উজবুক একটা!’ ডা. পারমিতা থামিয়ে দেন রাখালকে।
‘আমি ওই কবরের কাছেও গিয়েছি। ওইখানে কাউকে দেখিনি। কেউ কাঁদেও না।’ ছোটন দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলো তার মতামত।
ডা. পারমিতা এবার ছোটনকে ধমক দেন, ‘কে বলেছিলো তোমাকে ওখানে যেতে?’
‘আমার হঠাৎ ইচ্ছে হয়েছিলো। আমি জানতাম আমি ভয় পাবো না, তাই গিয়েছি। তুমি কাঁদবে জানলে যেতাম না আম্মু!’ ছোটন বলে।
‘আর কখনোই যাবে না।’ দাদু বললেন।
গতরাতের করা কোনো পরিকল্পনাই ওদের বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সবার কড়া নজর ওদের দুভাইয়ের ওপর। ছোটনের হারিয়ে যাওয়ার খবরটা গোপন থাকলো না। মোবাইলে সয়লাব হলো আরো দূরদূরান্ত। খবরটা আরমান চৌধুরীর কানে পৌঁছুলে তক্ষুনি তিনি আর খন্দকার বাড়িতে না এসে পারেননি। তিনি ছোটন, বড়’র দাদা খন্দকার মোতালেব হোসেনকে বললেন, ‘দেখেছেন চাচা, এইটুকু একটা ছেলে প্রমাণ করে দিয়েছে, এই গ্রামে ভূতটুত কিছু নেই। চল্লিশ বছর ধরে মানুষ যে-ধারণা কঠিনভাবে পোষণ করে আসছিলো, আজ এইটুকু ছেলে তা অল্প কিছু সময়ের মধ্যে মিথ্যে করে দিলো। এইবার আমি একটা সত্যি গল্প লিখবো। কী যেনো তোমার নাম? ছোটন?’
‘আমার নাম তূর্য! আমার ভাইয়ের নাম তুহিন।’
‘তবে যে সবাই তোমাকে ছোটন বলে?’ আরমান চৌধুরী বললেন।
‘দাদা আমাদেরকে ছোটন আর বড় বলে ডাকেন, তাই আমি ছোটন, আর ও বড়।’
‘আচ্ছা তূর্য, তুমি একা কেন ওইখানে গেলে, তোমার ভাইকে তো সঙ্গে নিতে পারতে?’ আরমান চৌধুরী বললেন।
‘আমি যখন যাই, তখন আমার নিজেকে ছোট মনে হয়নি।’ ছোটন বললো।
‘কী, বড় মনে হয়েছিলো নিজেকে?’ আরমান চৌধুরী বললেন।
‘না, বড়ও মনে হয়নি। আমি শুধু ভেবেছিলাম, যেখানে আমার দাদার বাবা বসবাস করতেন, আমি একা, এরকম একটা সময়ে সেখানে গেলে আমি সেই সময়টাকে স্পর্শ করতে পারবো। মনে হচ্ছিলো, আমি অন্তত একশো বছর আগে ফিরে যাবো।
‘ঠিক বলেছো, অতীতে ফিরতে চাইলে কাউকে নিয়ে ফেরা যায় না। সেখানে একাই যেতে হয়। বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার…।’ আরমান চৌধুরী বললেন।
‘আমার মা-বাবা ডাক্তার, চাচা-চাচি ইঞ্জিনিয়ার, দাদা উকিল ছিলেন, আমি আপনার মতো লেখক হবো।’
‘কেন তোমার লেখক হতে সাধ হলো?’ আরমান চৌধুরী বললেন।
‘জানি না তো!’ ছোটন বললো।
‘না জানলেও তুমি যেন লেখকই হতে পারো, এই আশীর্বাদই আমার থাকলো। চলো, তোমরা দুভাই আজ আমার সঙ্গে ঘুরবে।’ আরমান চৌধুরী বললেন।
আশেপাশে থাকা ডা. পারমিতা, ডা. রাকিব নতুন করে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। বললেন, না না, আজ অনেক ধকল গেছে, আজ থাক।
আরমান চৌধুরী বললেন, ‘ধকল তো আপনাদের গেছে। ওরা দিব্যি ভালো আছে। সঙ্গীসাথির অভাবে আমারও অনেকদিন গ্রামটা ঘুরে দেখা হয় না। না, আজ আর নিষেধ করবেন না। আমার নিজের ঘর-সংসার নেই। ছেলেমেয়ে নেই, তাই বলে আমি ছেলেমেয়ের কদর বুঝি না, তা ভাববেন না।’
ডা. পারমিতা অপরাগ হয়ে বললেন, ‘তা ওদের নিয়ে কোথায় যেতে চান?’
আরমান চৌধুরী বললেন, ‘আগে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাই, এই তো কাছেই। বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ওদের মিলিয়ে দিই। দুই বংশের দীর্ঘ দিনের বিরোধের জেরটা ওদের মধ্যে আর প্রবাহিত না হোক ভাবি।’
খন্দকার মোতালেব হোসেন উকিল হলেও কাউকে কখনো অন্যায় বুদ্ধি দেননি। আর আজ জীবনসায়াহ্নে এসে তিনি ভীষণভাবেই চান, মানবতার জয় হোক। রোধ হোক মূল্যবোধের অবক্ষয়। তাই তিনি আরমান চৌধুরীকে বললেন, ‘তুমি কেমন লেখক হয়েছো হে আরমান?’
আরমান চৌধুরী লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘কী করলে ভালো লেখক হবো আপনি বলে দেন চাচা।’

খন্দকার মোতালেব হোসেন বললেন, ‘তুমি শুধু তূর্য আর তুহিনকে তোমাদের বাড়ি নিতে চাচ্ছো? এতোগুলো ছেলেমেয়ে এখানে জড়ো হয়ে আছে, এই সুযোগ তুমি আর পাবে? যাও, তুমি এদের সবাইকে নিয়ে যাও। তবে শর্ত একটা, দুপুরের আগে সবাইকে নিয়ে তুমি ফিরে আসবে। মানে তোমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েদেরও এদের সঙ্গে দল বেঁধে নিয়ে আসবে। দুপুরে সবাই আমার বাড়ি ভাত খাবে। তুমিও খাবে হে লেখক। রাখাল, বড় খাসিটা জবাইয়ের ব্যবস্থা কর!

রোদ তখনও অতোটা ঝাঁঝ ছড়ায়নি। দু-চারজন করে মানুষ মাত্র বড় রাস্তার দিকে উঠে আসছে। একঝাঁক শিশু-কিশোরকে একজন বড় মানুষের সাথে এমন ঘন হয়ে হাঁটতে দেখে তারা ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। ছোটন চলছে একেবারে আরমান চৌধুরীর তর্জনী ধরে। যেন তারই নেতৃত্বে সবাই চলছে। পেটে চোঁ চোঁ ক্ষুধা নিয়েও হঠাৎ আরমান চৌধুরীর খেয়াল হলো, আসলে তিনি নিজেই ছোটনের তর্জনী ধরে আছেন। এতে তার মন্দ লাগলো না। ভাবতে ভালো লাগলো, উত্তরসুরী শুধু রক্তের ভেতর জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় নিজের বংশের বাইরেও। না হলে একজন মাত্র মানুষ বঙ্গবন্ধু। তার ডাকে বাংলার সব মানুষ একত্র হলো কেন? মহাকালের বুকে এতো খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, আমাদের স্বাধীনতার জন্ম হলো যখন!
শুভ চেতনাকে জয়ী করে তুলতে যে সাহস, যে মূল্যবোধের প্রয়োজন, যেতে যেতে আরমান চৌধুরী সে রকম গল্পই সবার উদ্দেশ্যে বলে যাচ্ছেন।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...