জনয়িতা | ১ম পর্ব || আফরোজা অদিতি

ধারাবাহিক উপন্যাস

185
bdtruenews24.com

কেবল সকাল হচ্ছে। পাখি ডাকছে। আকাশ স্বচ্ছ নীল। ঝিরঝির বতাস বইছে। এখনও মানুষের কোন কথা নেই, পায়ের আওয়াজ নেই। নিঃশব্দ প্রকৃতি। শুয়ে আছে ফাতেমা। উঠতে ইচ্ছা করছে না। কী হবে এতো সকাল সকাল উঠে। এ সংসারের কাজ করেই বা ওর কী হবে! এই সংসার তো চোখ ভরা জল ছাড়া আর কিছু দেয়নি আজ পর্যন্ত। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। গতকাল থেকে না খেয়ে আছে।

মহব্বত শুয়ে আছে। মহব্বত দুইদিন পর কাল মাঝরাতে এসেছে। দোকানের মাল কিনতে ঢাকা গিয়েছিল। জার্নির ধকল, অঘোরে ঘুমাচ্ছে। একবার তাকিয়ে দেখল গাঢ় ঘুমে তলিয়ে আছে মহব্বত। এখানে মহব্বত, ওর স্বামীই তার একমাত্র আপনজন। কিন্তু স্বামী আর কতক্ষণ বাড়ি থাকে; কাজ ফেলে পুরুষ মানুষ কী বাড়িতে বসে থাকতে পারে; পারে না। কাজ ফেলে বাড়িতে থাকলে আরও বদনাম। সবাই বলবে বউয়ের আঁচল-ধরা। নাহ্! স্বামী সম্পর্কে এ কথা শুনতে পারবে না ফাতেমা।

ফাতেমার বয়স ২০। বিয়ে হয়েছে ৫ বছর। বিয়ের ৫ বছরে একদণ্ড শান্তি পায়নি ও। সারাক্ষণ শুধু কেঁদেছে। আগে সারাদিন কাঁদতো; এখন কাঁদতে চায় না। সব সময় তো কারও কাঁদতে ভালো লাগে না। ওরও ভালো লাগে না। কী হবে কেঁদে; শুধু শরীর নষ্ট, মনে কষ্ট। শাশুড়ির উঠতে-বসতে খোঁটাও সহ্য হয় না। তবুও মুখ বুঁজে থাকে। কথাও বলে না, কাঁদেও না। তাছাড়া এখানে তো মন খুলে কাঁদতেও পারে না ও। কাঁদলেও শাশুড়ি দোষ ধরে। তাই ‘অগত্যা মধুসুদন’ ও চুপ করে থাকে।

মহব্বতের মুখের দিকে তাকিয়ে কান্না পেলো ফাতেমার। অনেকদিন পর, ছোটবেলাকার মতো কাঁদতে ইচ্ছা করছে ওর। ছোটবেলাকার অভ্যাস ছিল রাগ হলেও কাঁদতো, কষ্ট পেলেও কাঁদতো। যে কথায় কারও কান্না পায় না, সেই কথায় দুই চোখ ভাসিয়ে দিতো ও। ছোটবেলায় ওর নামই হয়ে গিয়েছিল ছিঁসকাঁদুনে। আজও সেরকম কাঁদতে ইচ্ছা করছে।

বাব-মায়ের আদরেই বড় হয়েছে। লেখা-পড়া করার ইচ্ছা থাকলেও পড়তে পারেনি। গ্রামে স্কুল ছিল না। বাবার সঙ্গতিও ছিল না। ছয় ভাই-বোন ওরা। সবার মধ্যে বড় ফাতেমা। ফাতেমার জন্মের সময় ফাতেমার বাবার অনেক জমি ছিল। তাই আদর-আহ্লাদের কমতি ছিল না। কিন্তু এখন বাবা অন্যের জমিতে কামলা দেয়। পরের জমিতে কামলা দিয়ে এত গুলো মানুষের আহার জোটাতে খুব কষ্ট করতে হয় বাবাকে। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ার কথা বলেনি, পড়তেও চায়নি ফাতেমা। বাবাকে খুব ভালোবাসে ফাতেমা।

শাশুড়ি সারাদিন খোঁটা দিতে থাকে। প্রথম প্রথম ছিল বাপে খাইতে দিতে পারে নাই, তাই সাত-তাড়াতাড়ি পার কইরা দিছে। আমার এত্ত সোন্দর পোলাডা কিছুই পাইলো না। খাট-পালং তো দূরে থাক একটা মোটর সাইকেল পাইলেও তো হইতো। এখন ওই কথার সঙ্গে যোগ হয়েছে, বাঁজা মাইয়া মানুষ।

ওর খুব কান্না পেতো। লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতো। কাঁদলেও আবার গালাগালি শুনতে হতো। সংসারের অ-কল্যাণ না কইরে ছাড়বো না দেখি কালামুখি মাইয়া-মানুষ।

ওর বাচ্চা হয় না এটা কার দোষ! কাকে দোষ দিবে ফাতেমা। ওর নিজের দোষ, না মহব্বতের। নাকি ওর ভাগ্যের! ভাগ্যের দোষ ছাড়া আর কী বলবে ও! কী-ই বা বলার আছে ওর? ডাক্তার দেখাতে রাজী হয় না মহব্বত। বলে, চুপ থাক! পোলা-মাইয়া যে হইতেই হইবো, এই রকম কথা কোন বইয়ে লেখা আছে ক’ তো দেখি! ফাতেমা মহব্বতকে কিছু বলতে পারে না। শাশুড়ির মুখ ঝামটা, গালাগাল মুখ বন্ধ করে শুনতে থাকে। যতক্ষণ শুনতে পারে শোনে, আর মুখ বন্ধ করে কাজ করতে থাকে। তারপর নিজের ঘরে বসে থাকে।

ওর যাওয়ার জায়গা নেই। ওর বাবার যদি অবস্থা ভালো থাকতো ও চলে যেতো। তবে যেতে পারতো কিনা সন্দেহ হয় নিজেরই। ও তো মহব্বতকে ছাড়া থাকতে পারবে না। আর ওর স্বামী, মহব্বতও ওকে খুবই ভালোবাসে! ওর তাই মনে হয়। ‘চকচক করলেই সোনা হয় না’ এমন তো নয় মহব্বত; মহব্বত খাঁটি সোনা। পানি ছাড়া যেমন গাছ বাঁচে না, জীবন বাঁচেনা তেমনই মহব্বত ছাড়া ওর জীবনও বাঁচবে না এটা জানে ফাতে মা। কিন্তু কী করবে ফাতেমা শাশুড়ি যেভাবে হাতধুয়ে লেগেছে তাতে মনে হয় মরণই লেখা আছে কপালে। তবে আত্মহত্যা! ও আত্মহত্যার কথা কল্পনাও করতে পারে না কখনও; যে জীবন ওর দেওয়া নয় সে জীবন নিজের হাতে নিবে কেমন করে? একথা ভাবতেও গা শিরশির করে; লোম খাড়া হয়ে যায়। সব কপালের দোষ; একটা কষ্টভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতেমা।

ফাতেমার বাবাও মেয়ের কষ্টে কষ্ট পায়। ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে যায়। তবুও স্বান্তনা দেয়মেয়েকে। বলে, মা-রে দুঃখ করিস না। এ আমাগো কপালের দোষ! তা না-হইলে আমার জমা-জমি ক্যান থাকবো না মা! আমার ক্যান এত্তগুলান পোলাপান হইব ! ক্যান মুনিষ খাটবো আমি পরের বাড়ি। তুই-ই ক!
ছয়জন পোলাপান আর আমরা দুইজন! বেবাকতে মিলা আটজন মানুষের মুখ-জীবন! সোনা -মা জুটাইবার না পাইরা তরে এই অল্প বয়সে বিয়া দিলাম। একখান মুখ কমবো। তুই, তোর বাপডারে মাফ কইরে দিস রে মা, মাফ কইরা দিস।

ফাতেমার বাবা, ইজাজ মুন্সি, অন্যের জমি চাষ করে। জমি-জিরেত ভালোই ছিল কিন্তু এখন নাই। কিছু গেছে নদী ভাঙনে, কিছু ফাতেমার মায়ের কঠিন অসুখের সময়। এখন থাকার মধ্যে এই ভিটে। সারাদিন কামলা খেটে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয় তার। করার কিছু নাই! সব তার কপালের দোষ! ফাতেমার মতো ইজাজ মুন্সিও কপাল মানে! ভাগ্য ভালো না তার! ভাগ্য ভালো হলে হাল থাকতো, হালের গরু, জমি থাকতো, পুকুর ভরা মাছ, গোলা ভরা ধান সব থাকতো! সব সব থাকতো তার! কপাল মন্দ দেখেই কিছুই আজ তার নাই, আছে শুধু গন্ডা গন্ডা ছেলে-মেয়ে!


ফাতেমা এ বিয়েতে রাজী ছিল না। আরও পড়তে চেয়েছিল। অন্তত এসএসসি.। কিন্তু বাবার কথায়, বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সে-কথা বলতে পারেনি। বিয়েতে না বলতেও পারেনি। অবশ্য ফাতেমা জানে, ও কবুল না বললেও শাড়ির ওপারের কাজী সাহেব আর স্বাক্ষীরা কবুল শুনতে পাবে। ফাতেমা এসব কিছুর মধ্যে যায়নি। বাবাকে অযথা হয়রানির মধ্যে ফেলতে চায়নি ও। বাবা অন্ত প্রাণ সে। খুবই ভালোবাসে বাবাকে। তাছাড়াও ওর কিশোরী শরীরে যৌবনের চিকন আলো পড়তে শুরু করার পরই লক্ষ্য করেছে পাড়ার বখাটে ছেলেদের চাল-চলন কেমন ধারা বদলে গেছে! যাদের সঙ্গে খেলত তারাও ঠারে-ঠারে চাইতে শুরু করেছে। সুন্দর, সোমত্ত মেয়েকে নিয়ে বাবা বিপদে পরতে চায়নি, ও নিজেও বিপদে ফেলতে চায়নি বাবাকে।


ও ভয় পেয়েছিল। ওরা গরীব মানুষ। বাবার শক্তি নাই। কেউ যদি ওর ইজ্জতের ওপর হামলা করে তাহলে আত্মহত্যা ছাড়া পথ থাকবে না। শুধু ওর না ওর বাবাকেও ঐ পথই বেছে নিতে হতো। তখন অপোগণ্ড এই ভাইবোনেরা জলে ভেসে যেতো।

ফাতেমাকে ৫ বছর আগে ও বাড়ি থেকে শেকড়শুদ্ধ তুলে এনে এ বাড়িতে বপন করে দিয়েছে ওরা। অন্য মাটি থেকে তুলে আনা গাছ যেমন প্রাণপণ চেষ্টা করে অন্যমাটিতে বেঁচে থাকার জন্য ফাতেমারও সেই চেষ্টা। ফাতেমা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কত করা যায়। মাঝে মাঝে শাশুড়ির গঞ্জনায় বিষ খেতে ইচ্ছা করে! কিন্তু পরকাল! আল্লার ভয়!

ইহকালে আর সুখ পাবে সে ভরসা তো নেই। এখন বিষ খেয়ে পরকালের সুখ খোয়াবার ইচ্ছা ফাতেমার নেই। গরীবের সবকিছুতেই ভয়। চাইতে ভয়, পাইতেও ভয়। একটাই মুখের বুলি, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।

গরীব মানুষ- যার টাকা নেই তার মন এমনি ছোট হয়ে থাকে, তারপর এ সমাজ সংসারের বাঁধন তাকে অষ্টেপৃষ্ঠে এমন সব নিয়ম নামের অনিয়মের মধ্যে বেঁধে রাখে যে গরীবের আর এপাশ ওপাশ করার ক্ষমতা থাকে না। ফাতেমার অবস্থাও সেই রকম। ফাতেমা না পারছে বাবার বাড়ি যেতে না পারছে শ্বশুর বাড়ি থাকতে। না পারছে মরতে, না পারছে বাঁচতে। একই ভয় পাছে লোকে কী বলবে! পরকালে আল্লার কাছে কী জবাব দিবে?

বিয়ের একবছর পর থেকেই শাশুড়ির বংশের বাতির জন্য বায়না। সেই সঙ্গে চলছে নানান রকম তাবিজ-কবজ। ঝাঁড়-ফুঁক। শাশুড়ি কয়েকবার পীর-সাহেবের বাড়ি নিয়ে গেছে! গলায়, হাতে হরেক রকম তাবিজ। বাচ্চা হয়নি! ফাতেমার শাশুড়ি আশা ছাড়েনি! এখন বংশের বাতির আশা ছেড়ে দিয়েছে। শুরু হয়েছে রাগারাগি, শাপ-শাপান্ত। যেন বাচ্চা না-হওয়ার দোষ ফাতেমার! ফাতেমা ইচ্ছা করে যেন বাচ্চা নিচ্ছে না।

আগে শাশুড়ি রাগ করতো না! ছয়মাস আগে থেকে রাগের শুরু। আর প্রতিদিনের গজর-গজর।
ছয়মাস আগের এক বিকেলে এক পীরের কথা মনে পড়ে ফাতেমার। শাশুড়ির সঙ্গে গিয়েছে সেই পীরের বাড়ি। ওই পীর যে এতো বড় ভন্ড তা জানতো না ফাতেমা। শাশুড়ি তো বাবা বলতে অজ্ঞান!

পীরের কাছে যখন ওর ডাক আছে তখন ওকে একলা রেখে সবাইকে চলে যেতে বলে পীরের খাদেম। আর পীর ঝাঁড়-ফুঁকের নাম করে ফাতেমার শরীরের যত্র-তত্র হাত দিতে থাকে। রাগে দুঃখে পীরকে গালি দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শাশুড়িকে বলে, আম্মা, আমি আর কোনদিন কোন পীরের কাছে আসবো না। আমার বাচ্চা হোক চাই না হোক।

শাশুড়ি আশ্চর্য!
কী কথা কও বউ! পীরের কাছে আসবা না! ক্যান কী করছে!
ফাতেমা সবকথা খুলে বলে।
ছিঃ বউ ! পীরের নামে বদনাম। তওবা করো বউ, তওবা করো!
তওবা ক্যান করবো মা। এই ভন্ড পীরের জন্য তওবা। জান গেলেও না মা। এই ভন্ড পীরের দোয়ায় আমার বাচ্চা হওয়া তো দূরের কথা মা, বাচ্চা পেটেই আসবে না ! আর আসলেও সেই বাচ্চা আপনার বংশের হবে না মা।

সেই রাগে শাশুড়ির কথা বন্ধ। সেই রাগ আজও কমেনি। ওর সঙ্গে কথা বলে না। ঘুম থেকে উঠে শোয়া পর্যন্ত শুধু মুখে একই কথা বাঁজা মেয়ে মানুষ। বাঁজা মেয়ে মানুষের সঙ্গে আরও নানান কথা মিলে মিশে যায়। ফাতেমা ভাবে, শাশুড়ির কোন কথা গায়ে মাখবে না। কিন্তু পারে না!

শাশুড়ির কথা গায়ে মাখতে না চাইলেও তার বলা কথাগুলো তীরের ফলার মতো মনের ভেতর ঢুকে এফোঁড় ওফোঁড় হৃদয়টাকে চিরে চোখে জল হয়ে বেরিয়ে আসে। শুরু হয় রক্তক্ষরণ।

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: