ছুটিতে ঘুরে আসুন নাফাখুম

160
bdtruenews24.com

মেঘ পাহাড়ের দেশ বান্দরবান। ওখনে পাহাড় আর মেঘেরা মিতালী করে সকালে, দুপুরে রাতে। সেখানে চিম্বুক, কেওক্যারাডং এর চূড়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় পেজা তুলোর মতো মেঘেরা।

তবে শুধু মেঘের টানেই নয় বান্দরবান টানে তার সুবিস্তৃত সবুজের তরঙ্গরাশির জন্য। বান্দরবান টানে সেখানকার নৃতাত্বিক বৈচিত্রের জন্য। আরও টানে সাঙ্গুতে নৌবিহার আর সেখানকার আরেক বিস্ময়কর সৌন্দর্য্য নাফাখুম ঝর্ণার রূপ। আজ আমরা আপনাকে জানাবো এই চিরযৌবনা নাফাখুম ঝর্ণার আদ্যোপান্ত।

বাংলাদেশের সর্ব পূর্বের  উপজেলার নাম থানচি। এই উপজেলার একটি এলাকার নাম রেমাক্রি। এটি একটি মারমা অধ্যুষিত এলাকা। যে স্থানগুলোর কারণে এই জেলাটি পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তার একটি হচ্ছে ‘নাফাখুম ঝর্না’। আর এই রেমাক্রি গ্রামটিকে কেন্দ্র করেই এই নাফাখুম ঝর্নাটি অবস্থিত।

রেমাক্রি থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টার হাঁটা দূরত্বে এই ঝর্নাটি অবস্থিত। রেমাক্রি খালের পানি প্রবাহ এই স্থানে এসে বাঁক খেয়ে প্রায় ৩০ ফুট নিচে পতিত হয়ে প্রকৃতির অপরূপ ছোঁয়ায় সৃষ্টি হয়েছে অসাধারণ এই ঝর্নাটি ।

রেমাক্রী খালে এক ধরনের মাছ পাওয়া যায়, যার নাম নাফা মাছ। এই মাছ সবসময় স্রোতের ঠিক বিপরীত দিকে চলে। বিপরীত দিকে চলতে চলতে মাছগুলো যখন লাফিয়ে ঝর্না পার হতে যায় ঠিক তখনই পাহাড়িরা লাফিয়ে ওঠা মাছগুলোকে জাল বা কাপড় দিয়ে ধরে ফেলে । স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা যায়, স্থানীয় মারমা ভাষায় ‘খুম’ শব্দের অর্থ ঝর্ণা । এ থেকে এই ঝর্ণার নাম দেওয়া হয়েছে নাফাখুম ঝর্ণা ।

সুন্দরের রাণী নাফাখুম

মাথার উপরে খোলা আকাশে রৌদ্র-ছায়ার লুকোচুরি খেলা আর নিচে খরস্রোতা নদীর ধেয়ে আসা ছলাৎ ছলাৎ কল্লোলধ্বনি। সব মিলিয়ে এ যেনো স্রষ্টার এক অপরূপ সৃষ্টি। চারিদিকে পাহাড়-পর্বত, নদী ও পাথুরে খাল দেখে যে কারো মনে হতে পারে যেনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি চোখের সামনে ভাসছে ।nafakhum-online-dhaka-guide

সাধারণত বর্ষাকালে পাহাড় থেকে  তীব্র গতীতে পানি নিচের দিকে পতিত হয় এবং গ্রীষ্মকালে তীব্রতা কমে যায় ও ঝর্ণার আকার ছোট হয়ে আসে। তবে যারা নাফাখুম ঝর্নার প্রকৃত সৌন্দর্য দেখতে চান তারা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের মধ্যে ভ্রমণ করলে তা দেখতে পারবেন দুই চোখ ভরে। এই সময় উপর থেকে আছড়ে পড়া পানির প্রচন্ড আঘাতে ঝর্নার চারপাশে অনেকটা স্থান জুড়ে সৃষ্টি হয় ঘন কুয়াশার। বাতাসের সাথে উড়ে যাওয়া পানির বিন্দু পর্যটকদের দেহ মন সব আনন্দে ভিজিয়ে দেয়।

যেতে যেতে পথে বড় পাথরের বাঁকে

বান্দরবান থেকে নাফাখুম যাওয়ার পথে পর্যটকদের তিন্দু ও বড় পাথর নামক দুটি স্থান পাড়ি দিতে হয়। অসাধারণ সুন্দর এই তিন্দুতে একটি বিজিবি ক্যাম্প রয়েছে। তিন্দুতে পর্যটকদের জন্য রাতে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তিন্দু থেকে কিছুটা পথ সামনে এগোলেই বড় পাথর। স্থানীয়দের বিশ্বাস চলতি পথে এই পাথরকে সম্মান প্রদর্শন করতে হয় নতুবা যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে । স্থানীয় লোকজন এই পাথরকে রাজা পাথর বলে সম্বোধন করেন ।বড় পাথর একটি বিশাল আকারের পাথর এবং এর আশে পাশে আরও বেশ কিছু ছোট ছোট পাথর নদীর সোজা চলতি পথকে কয়েকটি বাঁকে ভাগ করে রেখেছে। যে কারণে এই স্থানে এলে পর্যটকদের নৌকা থেকে নেমে হেঁটে পাড়ি দিতে হয় । পর্যটকদের মতে, তিন্দু ও বড় পাথর স্থান দুটো পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা নাফাখুম ঝর্না দেখার সবচাইতে বড় আনন্দ ।ef0b6ee23f85d7726fdb465a6bc3f581

বড় পাথর থেকে ঘণ্টা খানেকের পথ পাড়ি দিলেই রেমাক্রী বাজারের দেখা মিলবে । রেমাক্রী বাজারের পাশেই পর্যটকদের জন্য একটি রেষ্ট হাউজ রয়েছে। আর রেষ্ট হাউজের পাশেই রয়েছে বিজিবি-র একটি ক্যাম্প। রেমাক্রী বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কুল ধরে হেঁটে নাফাখুম ঝর্নায় যেতে হয়। এই পথের দু ‘পাশের মনোরম দৃশ্যের কারণে পায়ের নিচের পাথুরে ও বালুকাময় পথটিও পর্যটকদের নিকট অনেক ভালো মনে হয়। এই পথ ধরে নাফাখুম ঝর্নার কাছে যেতে পর্যটকদের বার কয়েক কোমড় থেকে বুক সমান পানি পাড়ি দিতে হয় । পানিতে স্রোত থাকায় এই পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পর্যটকদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় ।পথে যেতে যেতে পর্যটকদের টারজানের মতো গাছের লতা-পাতায় ঝুলেও পথ পাড়ি দিতে হয়। এভাবে যেতে যেতে পথে ছোট ছোট আরও ১০টির মতো ঝর্না চোখে পড়বে । শীতল ঝর্নার পানি গায়ে পড়তেই সমস্ত ক্লান্তি ঝর্নার পানির সাথে মিশে রেমাক্রী খালে গিয়ে পতিত হবে ।একের পর এক রোমাঞ্চকর বাঁধা পেরিয়ে অবশেষে দেখা মিলবে সেই পরম আকাঙ্ক্ষিত নাফাখুম ঝর্নার ।

কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে বান্দরবান যেতে আপনি ট্রেন, বাস অথবা প্লেনে প্রথমে চট্টগ্রাম তারপর চট্টগ্রাম থেকে সোজা বান্দরবান । সেখান থেকে  পাবলিক বাস অথবা জীপ অথবা চান্দের গাড়িতে করে থানচি যেতে হয় । তবে পাবলিক বাসের চাইতে জীপ অথবা চান্দের গাড়িতে করে গেলে পথের সুন্দর সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে বেশি। সাঙ্গু নদীর পাড়ে অবস্থিত থানচি বাজার । থানচি পৌঁছানোর পর সেখান থেকে যেতে হবে ক্রেমাক্রী বাজার । রেমাক্রী বাজার হতে নাফাখুম ঝর্নার কাছে যাওয়ার একমাত্র অবলম্বন সাঙ্গু নদীর নৌকা। এখানে আপ-ডাউন ইঞ্জিনচালিত নৌকা পাওয়া যায় ।IMG_5520

এই নৌকা ভাড়া করার জন্য পর্যটকদের থানচি ঘাটে অবস্থিত নৌকাচালক সমিতির সাথে কথা বলতে হয় এবং সেখান থেকে বিজিবি-র তালিকাভুক্ত একজন গাইড নিতে হয়। এই পথে ভ্রমণে গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয় নৌকাচালক সমিতির অফিসে পর্যটকদের নাম, ঠিকানা, পিতার নাম, মোবাইল নম্বর, নৌকার মাঝির নাম প্রভৃতি রেজিস্টার করে ভ্রমণের অনুমতি নিতে হয় ।

সম্ভাব্য ব্যয়

ঢাকা হতে বান্দরবান (নন-এসি বাস) ৬২০ টাকা, এসি বাস ৯৫০ টাকা, বান্দরবান হতে থানচি (পাবলিক বাস) ২০০-২৩০ টাকা ,বান্দরবান হতে থানচি পুরো জীপ বা চান্দের গাড়ি  ৪,০০০/৫,০০০ টাকা,  রেমাক্রীতে পর্যটক যতদিন থাকবেন তার প্রতি রাতের জন্য নৌকা ভাড়া বাবদ ১,৫০০ টাকা,  গাইড (থানচি হতে রেমাক্রী) ৫০০ টাকা,  গাইড (রেমাক্রী হতে নাফাখুম) ৬৫০ টাকা ।

যে সকল জিনিসপত্র অবশ্যই সাথে রাখবেন

ঢাকা বা বান্দরবান থেকে যাত্রা শুরু করার আগে পর্যটকদের নিজ নিজ নাম, ঠিকানা, পিতার নাম, মোবাইল নম্বর প্রভৃতি একটি কাগজে লিখে সেই কাগজটি ১০/১২টি ফটোকপি করে সাথে নিতে হবে। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে এই কাগজ জমা দিতে হয় । মশা হতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ওডোমস ক্রিম সাথে করে নিতে হবে। ফাস্ট এইড বক্স ও টর্চ লাইট অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। সাথে রাখতে হবে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ, এন্টিসেপ্টিক ক্রীম, খাবার স্যালাইন, কলম, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ম্যাচ, শুকনো খাবার ও পানি ।

মোটামুটি সব  ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে নাফাখুম ঝর্ণার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া ভালো। কারণ সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে সুন্দরের অপার বিস্ময়।

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: