গোলাম মোর্শেদ চন্দন-এর কবিতা

165
bdtruenews24.com

কবিতা ভাবনা

না, আমি কবি নই কবিতার রাখাল। কবিতার পাঠক হতে গিয়ে মাঝে মধে দু’এক কলক কবিতার মতন শারীরীক অবকাঠামো তৈরি করি আর কি! যাকে ঠিক কবিতা বলা যাবে কি না সময়ের প্রশ্ন।

প্রকৃত কবিতা একজন কবির পূর্ণ বোধের ধ্যানস্ত ফসল।যা সেই কবি সর্বক্ষন যাপন করেন। কবিতা কখনো ভ্রম, কখনো বোধের অন্তরজাল, কখনো শব্দকে নৈঃশব্দে অবগাহণ করান। বিনয় মজুমদার বলেছিলেন-’কবির কাজ কবিতা লেখা, বোঝান নয়।’ জীবননান্দ যেমন ইঙ্গিতময়তাকে প্রধান্য দিয়েছেন রূপক,উপমা ও চিত্রকল্পের বহুগামী চেতনার ভেতর দিয়ে কাউকে বোঝাতে নয়। তাই পাঠক না বুঝেও তার কবিতা পাঠে একটা ভাললাগার আবেসে অবগাহণ করেছে। ঠিক তেমনি সুভাস মুখোপাধ্যায় যেন কবিতাকে প্রত্যহিক জীবনের ভাষার কাছে এনে ছেড়ে দিয়েও একটা আলাদা ঘরানা তৈরি করেছেন। সুজিত সরকার বলেছেন-‘শব্দ দিয়ে কবিতা রচিত হলেও কবিতা শব্দসমষ্টি নয়। শব্দ একটি মাধ্যম মাত্র। শব্দের সাহায্যে শব্দাতীত জগতে পাঠককে পৌঁছে দিতে চায় কবিতা।’ পৃথিবীর প্রতিটি কবি কবিতাকে তার নিজস্ব উপলব্ধি দিয়ে এক এক রকম সংজ্ঞায়িত করেন। এটাই কবিতাকে বহুগামী করে বলে- কবিতা এক সংজ্ঞাহীন উপলব্ধির নাম। যাকে সংজ্ঞায়িত করলে তার ব্যপ্তি কমে যায়। তাই আমি বলব কবিতা এক সংজ্ঞাহীন আরাধনা যাকে সার্বক্ষণিক যাপন করতে হয় ঘোর গ্রস্ততা দিয়ে।

জ্যোৎস্না বাড়ি


কতদিন জ্যোৎস্না দেখি না লনে? বুকপকেটের উষ্ণতা ফেরি করে আঁধারের ঘোর। ইদানিং কেমন যেন বদলাচ্ছে আলোদের বাড়িঘর? উঠান ভরছে ঝোপঝাড়। বেখেয়ালী ইচ্ছেগুলো কেমন করে তাকিয়ে থাকে আঁধারের টেরা কোটায়? চাঁদের বুকে শুধু-ই বালিয়াড়ির বাঁধ। জ্যোৎস্নারা সেই কবে উল্টো রথের মেলায়, খুলেছে দোকান। রোজ গিয়ে ফিরে আসি ভয়ে। আমার আর কেনা হয় না, আধুনিক জ্যোৎস্নার খৈ ফাটা হাসি। রোজ যাই তার ঘরে, রোজ ফিরে আসি!

জ্যোৎস্নাকে ফিরে ফিরে তবুও দেখি। সারিসারি মেঘের আলিঙ্গন, বিষাদের নীল জামা গায়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে… কখন যে হলুদ জরির ওড়না মাথা পড়ে, জানে না নিজেই ! চোখ ফেরায় সর্ষে ক্ষেত, আল ধরে চলতে চলতে… কথার কথায় সেঁ, আমার লাল জামা ছুড়ে মারে স্রোতে… নদী, ভেসে যায়, ভাসে। কে কারে বলে (?) আঁধার হাসে…

শেষরাতের স্বপ্ন


সবাই মিলে মশা তাড়াতে তাড়াতে দেখি- সকলেই মশা, অভিশপ্ত আকুতি—
দলের নারীদের বিলাপের সুরে ভারি হচ্ছিল জনপথ; পূর্বজন্মে ফেরার সে-কি…
হঠাৎ শীতল স্পর্শের লালজিহ্বা বের করতে করতে… ঠিকঠিক আওয়াজ।

একজন কান্না করতে করতে বাজি ধরে জীবন, রূপান্তরিত সময়গুলো;

যা হবার তাই— কিন্তু বিপত্তিটা ওখান থেকেই— আদিবাসী ও রূপান্তিতদের দ্বন্দ্ব।
কারা শক্তিশালী? ক্ষমতার বাগ-বিতণ্ডা…, হাতাহাতির পর্যায় এলেই—
আদিবাসীরা পৌরাণিক হুল নিয়ে আঘাত করলেই, মারি একটা ঘুষি..,’
খাটের সাথে বিকট ব্যথার ঘুম-জেগে ওঠে। শুনছি পাশে নাক ডাকছে কেউ,
ডাকবে কে আর? গভীর ঘুমে সুর তুলে… মশা তাড়ায় বউ…;

স্নান


তোমার দুপুর স্নান করাই জ্যোৎস্নার বাঁকলে শুয়ে

বিকেলটা ঘুম পাড়াও আলতামিরা
হাঁটতে হাঁটতে ঢলে পড়— আবির রং-এ…

সন্ধ্যায় আলো-আঁধারীর বিষন্ন উষ্ণতায়
বিপ্লবী হয়ে ভোলগা হোয়াংহোর ঘর।

তখনও মধ্যরাত বাকী স্নানঘরে বৃষ্টি-জল চুঁইয়ে পড়ে

—সেদিন পৃথিবীর সমান বয়সী হয়ে রিক্ত করেছিল…
সভ্যতার অসভ্য ভাঁড়ার!

আলো-আঁধারীর বৃত্ত


কার সাথে তাঁর বাড়ী তাঁর সাথে কার? আড়াআড়ি ছাড়াছাড়ি হলে-ই আঁধার। চোখ নেই চোখ তবু চোখের ভেতর! ঝলসিত রূপে সেঁ কাঁপায় অধর। রূপে রূপ জ্বলে ধুপ ধোঁয়ায় আকাশ, মৃত্তিকা কেঁপে ওঠে ইথারে বাতাস। শীতল উষ্ণতা স্নিগ্ধ আলোয়, বেজে ওঠে চারপাশ ঘুরলে বাঁদাড় (আবার আবার)। শূন্যে উঠান ভরা শূন্যতে বান, শুয়ে আছে একা একা দেখছি সঠান।

মিতাদের বাড়ী নেই, পুরোটা প্রাসাদ; চারদিকে ধু ধু মেঘলা ভূবন। উজান-ভাটিতে খেই, নেই যে বিষাদ; বিশাল বৃত্তে ঘুরছে সুজন। ঘুরছে সবাই আপন মনে ঘুরে ঘুরে পিছু, আমিও তাঁর আলো-আঁধার দেখি কিছু কিছু। খুললেই বৃত্ত কোথায় কৃতিত্ব; ঝুলেও ঝুলি না, দেখে যাই দেখি যা; বেজায় সেঁ নিত্য। হাসতে হাসতে কার সে বাঁশি আমায় বাজায়, মিতাদের বাড়ী নাকি ঘোরে-ই সাজায়। আপনে যাপনে যারা দিচ্ছে সাঁতার, সবকিছু তারঁ হলে ঘুচায় আঁধার। একা একা জ্বলে সেঁ আলোতে আঁধার; অরূপে স্বরূপে… জল… দিয়েছে সাঁতার ।

খোয়াড়ে চন্দ্রগ্রহন, মাতাল পূর্ণস্নান


সন্দেহের বসতিতে দিয়েছ প্রাচীর?
চারপাশে কুণ্ডলী; পাকানো ফণা

অধিগ্রহন করো হৃদয়; গড়ে উঠবে ইমারত, উদ্যান
সেখানে-ই রৌদ্র-ছায়া কলরোল

বারণ ভুলে মেতে ওঠো শ্রাবণ— ললিতকলায়।
ডুবে-ভেসে রোদ পোহায় শীত; মিষ্টতায়।
তুমুল মূর্ছনা কাঁপে আকাশ…
কামড়ে ধরেছে বোধ অক্টোপাস।
ঝড়ের জানালায়… প্রাচীর দিবে আয়ুষ্কাল।

কেন অপরাধ ভুলে জ্যোৎস্নার ক্ষুুধা?
কখনো তো ছিল না এমন ইট চাঁপা ঘাসের আঁধার;
কতটা বুঝেছ ঢেউ, অমীমাংসিত ব্যাকরণ।

ফেরাও কামনার ক্ষুধা; যমুনার রাই
চল দাঁড় বাই উজান নদী।
বিবাদের দোকানে খিল, উপড়ে ফেলো শেকড় সমেৎ।

উষ্ণতার লনে ঝুলে প্রাপ্তি আঁধার…

দুলে ওঠে প্রভাত ফেরী গান…
খোয়াড়ে চন্দ্রগ্রহন, মাতাল পূর্ণস্নান।

বাঙালদের কলকাতা


কবিতা তালি পায় দেখে হাসিরা বাজার করে রাত। আর বাপ-দাদার ভিটেমাটি
বিক্রিকরা পিসেমশাই চাকরী কাঁধে নিয়ে রোজ কলকাতার গড়ের মাঠ হয়ে ওঠে ।
একদিন না তাঁর কাঁধ থেকে ছোঁচট খেযে পড়ে গেল বোঝা সমেত চাকুরীর থালা ।
উপায়-অন্ত না দেখে আবার শুরু করে, শুরু দিয়ে। সারা জীবনের জমান খুচরা-
পয়সার দিকে চেয়ে থাকে — না’খাওয়া পেট; মোচড়াতে মোচড়াতে…; ক্ষুধা।
পয়সাগুলোর বিদ্রোহী প্রেতাত্মা গর্জন তুলতে তুলতে বলে— এভাবে জমবে না জীবন।
এবার নুতন ভাবনায়— অতীতের দোকান ঘুরে দেখে, নিরন্নে উপোসগুলোর কান্না।
পিসেমশাই ঐহিত্য মাথায় তুলে কৌশল আঁটে। যেভাবে জমে ছিল বাঁশে খুঁটিতে;—
সেই ভাবে নয়, জমাতে গিয়ে যে চিন্তাগুলোর অপচয় হয়েছে, তাকে এবার ক্রিয়ায়…;

পিসেমশাই এবার জীবনকে চাকা বানিয়ে ছুটতে থাকে। ফেরিওয়ালা জীবনটা, তা থৈ থৈ
জমিয়ে নয়, ব্যয় করে চেতনার বসতি।

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: