কেট চপিঙ-এর গল্প | অনুবাদ: কানিজ বুশরা মোম

138
bdtruenews24.com

মিসৌরী-মিসিসিপি নদী-বিধৌত শহর সেন্ট লুইসে ১৮৫০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি টমাস ও’ফ্ল্যাহার্টি এবং এলিজা ফ্যারিসের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের তৃতীয় সন্তান। মার্কিন ঔপন্যাসিক এবং ছোট-গল্পকার কেট চপিং (ক্যাথারিন ও’ফ্ল্যাহার্টি)। বর্তমানে যিনি বিংশ শতাব্দীর সাহিত্য জগতে নারী সমানাধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে অভিহিত।

আয়ারল্যান্ড থেকে প্রবাসিত টমাস ও’ফ্ল্যাহার্টি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, এলিজা ফ্যারিস সেন্ট লুইসের ফ্রেঞ্চ কমিউনিটির ঘনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। তাঁদের সন্তানেরা পঁচিশে পা ফেলার আগেই একে একে বিদায় নেন পৃথিবী থেকে, একমাত্র ক্যাথারিনই দীর্ঘায়ুর অধিকারী হন। রূপকথা, কবিতা, ধর্মীয় স্তুতি, সমকালীন উপন্যাসে আগ্রহ জন্মে তাঁর, কৌতূহলী পাঠক হয়ে ওঠেন তিনি।

১৮৭০ সালে অস্কার চপিংয়ের সাথে ২০ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়, বসবাস করতে শুরু করেন নিউ অরল্যান্সে এবং পরবর্তীতে ক্লাউটেয়ারভিলে; ২৪৩ হাইওয়েতে ৪৯৫ নম্বর বাড়িতে। তাঁর পরবর্তীকালীন লেখালেখির অনেক উপাদানেরই উৎস সেখানে, বিশেষ করে সে অঞ্চলের ক্রেওল সংস্কৃতি তাঁকে প্রভাবিত করে।

১৮৮০ সালে কেটকে ১২,০০০ ডলার দেনায় ফেলে অস্কার চপিং পরলোকগমন করেন। যদিও কেট চেষ্টা চালিয়ে যান তাঁর স্বামীর আবাদী জমি এবং জেনারেল স্টোর টিকিয়ে রাখার, কিন্তু দু’বছরের মাথায় বিক্রি করে দেন তা। এমিলি টোথের ভাষ্যানুসারে, ‘সে সময়ে বিধবা কেট একাধারে তাঁর প্রয়াত স্বামীর ব্যবসা দেখভাল করছিলেন, আবার স্থানীয় পুরুষদের সাথেও সম্পর্কে জড়াচ্ছিলেন ভয়ানকভাবে। এমনকি এক বিবাহিত কৃষকের সাথে প্রেমেও জড়িত হন তিনি।’ মায়ের অনুরোধে তিনি ফিরে যান সেন্ট লুইসে, যেখানে অন্তত আর্থিক সংস্থানের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। তাঁর ছেলেমেয়েরাও মানিয়ে নেয় সেখানে, কিন্তু পরের বছরই তাঁর মায়েরও দেহবসান ঘটে।

বিমর্ষ, বিষণ্ন কেটের তৎকালীন যা পরিস্থিতি; তাঁর পারিবারিক বন্ধু, ড. ফ্রেডরিক কোলবেনহেয়ার এর ধারণামতে, সেই কঠিন সময়ে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করাটা কেটের জন্য ছিল মানসিক সুস্থতাকে টিকিয়ে রাখার প্রতিবিধান, নিজের অসাধারণ কর্মশক্তির প্রয়োগস্থল, এবং অর্থোপার্জনের অন্যতম পন্থা।

নানারকম জায়গা, ঘটনা, জীবনধারার মধ্যে সময় কেটেছে কেটের। বৈচিত্রপূর্ণ এই জীবনযাত্রার সূচনা ঘটেছে আইরিশ এবং ফ্রেঞ্চ পরিবারিক আবহাওয়ার মাঝে, বিবাহিত জীবনে পরিচিতি ঘটেছে ইয়োরোপীয়-নিগ্রো সংমিশ্রিত জাতির সংস্কৃতির সাথে, বৈধব্যে মুখোমুখি হয়েছে অর্থনৈতিক বিহ্বলতা, সেই সাথে অনুভূত হয়েছে নারী ক্ষমতায়নের প্রয়োজনিয়তা।

এসব কিছুরই প্রভাব পড়েছে তাঁর সাহিত্যকর্মে। ১৮৯০এর দিকে কেটের ছোটগল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রকাশিত হতে শুরু করে বিভিন্ন পত্রিকায়, এমনকি St. Louis Post-Dispatch-এর মত সাময়িকীতেও। যদিও তিনি সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে তাঁর লেখা প্রকাশে সক্ষম হন, কিন্তু সেসময় স্থানীয় ‘local color’ লেখিকা হিসেবে পরিচিতি হয় তাঁর। বলতে গেলে উপেক্ষিতই ছিল তাঁর ধারালো লেখনীশক্তি। ‘

বেশ কিছু ছোটগল্প লেখেন তিনি ১৮৯২-১৮৯৫ সালের মাঝে, শিশুতোষ-প্রাপ্তবয়স্ক দু’ ধরনেরই; যেগুলো প্রকাশিত হয় অ্যাটলান্টিক মানথলি, ভগ, দ্য সেঞ্চুরি ম্যাগাজিন এবং দ্য ইয়োথ’স কমপ্যানিয়ন এর মতো সাময়িকীগুলোয়। তাঁর সাহিত্যকর্মের সেরা নিদর্শনগুলো সংকলিত রয়েছে দুইটি ছোট-গল্পগ্রন্থে: বায়্যু ফোক (১৮৯৪) এবং আ নাইট ইন অ্যাকাডি (১৮৯৭)। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পগুলো হচ্ছে: ডেজারে’স’ বেবি (১৮৯৩), দ্য স্টোরি অব অ্যান আওয়ার (১৮৯৪), দ্য স্টম্র্(১৮৯৮)। দুটো উপন্যাসও লেখেন তিনি, অ্যাট ফল্ট (১৮৯০) এবং দ্য অ্যাওয়েকেনিং (১৮৯৯)।

‘ডেজারে’স বেবি’ গল্পে চিত্রিত হয়েছে উনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকার দক্ষিণাংশে বসবাসরত ক্রেওল জাতির প্রতিচ্ছবি; যখন দাসত্ব, বর্ণবাদীতা ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা। ধামাচাপা দেয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া এসব ইস্যুগুলোকে তুলে ধরতে কোনো দ্বিধা ছিল না কেটের, আর তাই সেই পরিস্থিতির প্রকৃত রূঢ় সত্য উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে।

তৎকালীন সমাজে তাঁর অঞ্চলের নারীদের জীবনযাত্রা এবং অবিরাম প্রতিকূলতাকে তাঁদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবেই দেখেছেন কেট। মেওপ্যাসান্টের কৌশলের সাথে নিজের রচনাশৈলীর সংমিশ্রন ঘটিয়ে সেই মানবীদের আত্মকথাকে হৃদয়ঙ্গম করে ফুটিয়ে তুলেছেন কাগজের পাতায়। ‘দ্য স্টোরি অব অ্যান আওয়ার‘ সেরকমই এক উপাখ্যান।

১৮৯৮ সালে রচিত হলেও কেটের জীবদ্দশায় প্রকাশ পায়নি ‘দ্য স্টম্র্’। এটি মূলত ‘বায়্যু ফোক’ গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত ‘অ্যাট দ্য কেডিয়ান বল’ এর সিকুয়্যাল। এ গল্পের উপজীব্য বিষয় বিয়ে-বর্হিভূত অবৈধ সম্পর্ক, সেসময়ে যা প্রকাশ্যে আলোচনা করাও ছিল রীতিমত অনৈতিক।

তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস,‘দ্য অ্যাওয়েকেনিং’ প্রকাশের পর তাঁকে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, বইয়ের বক্তব্য এবং সাহিত্যিক মানের জন্য। নিষ্ঠুর সমাজের অদ্ভুত রীতিতে আবদ্ধ থাকা এক নারীর কাহিনি হচ্ছে এই বইয়ের মুখ্য বিষয়। পরবর্তী কয়েক দশক কেটের সৃষ্ট সাহিত্যের এই শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্তটি অপ্রকাশিতই ছিল এবং এখন, এই উপন্যাস এর নৈপুণ্য এবং বিষয়বস্তুর প্রয়োজনিয়তার জন্যই বহুল নন্দিত।

সেসময়ের খুব বেশি লেখক কেট চপিংয়ের মতো এতো গাঢ় বাস্তবতাসম্পন্ন বিষয় নিয়ে ভাবেননি তেমন একটা। এক্ষেত্রে বলা যায়, তিনি তাঁর সময়ের আগে চলেছেন, দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছেন বহুদূর। অবশ্য তাঁর পৌত্র ডেভিড চপিংয়ের ভাষায়, ‘কেট ফেমিনিস্ট ছিলেন না, ছিলেন না স্যাফ্রোজেটও। তিনি শুধুই একজন নারী হিসেবে নারীত্বকে গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন, বিশ্বাস রেখেছেন নারীর পরাক্রমতায়।’

বেথ কোর্টনি পরিচালিত লুইসিয়ানা পাবলিক ব্রডকাস্টিং একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে কেটের জীবনীকে কেন্দ্র করে, যার নাম; কেট চপিং: দ্য রিঅ্যাওয়েকেনিং।

১৯০৪ সালে সেন্ট লুইস ওয়ার্ল্ডস ফেয়ার পরিদর্শনের সময় ২০ আগস্টে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এর দু’দিন পরেই মাত্র ৫৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান কেট চপিং। সেন্ট লুইসেরই ক্যালভেরি সেমেটেরিতে সমাধিস্থ করা হয় সাহিত্যের এই অবহেলিত কারিগরকে।


এক ঘন্টার গল্প


মিসেস ম্যালার্ড হৃদরোগে আক্রান্ত, তাই যতটা সম্ভব সাবধানতার সাথে, যথেষ্ট ধীরস্থিরভাবে তাঁকে জানানো হল খবরটা; তাঁর স্বামীর মৃত্যু সংবাদ।

ঘটনার প্রায় অর্ধেকই গোপন রেখে, ভাঙা ভাঙা বাক্যে, প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে, তাঁর বোন জোসেফিন জানালেন তাঁকে ব্যাপারটা। তাঁর স্বামীর বন্ধু রিচার্ডও আছেন সেখানে, তাঁর কাছে। তিনিই পত্রিকা অফিসে ছিলেন যখন রেলওয়ে দুর্যোগের খবরটা পাওয়া যায়, সেই সাথে ব্রেন্টলি ম্যালার্ডের নামসহ একটা তালিকাও; ‘নিহত’দের তালিকা। তিনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় টেলিগ্রামটার পাওয়া অব্দি অপেক্ষা করেন, আর এরপরেই তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসেন জানাতে; যাতে কোনো উদাসীন, কোনো অসাবধানী বন্ধুর কাছ থেকে খারাপ খবরটা শুনতে না হয় তাঁকে।

অন্যান্য নারীরা যেভাবে গ্রহণ করেন এধরণের সংবাদকে, ঘটনার মর্মার্থকে মেনে নেয়ার যে অক্ষমতা দেখা যায় তাঁদের মধ্যে; মিসেস ম্যালার্ডের ক্ষেত্রে তেমন কিছু হল না। বোনকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন একবার, হটাৎ করেই; এরপর শোকের তীব্রতা কেটে গেল আপনাআপনিই, উঠে চলে গেলেন নিজের রুমে, একাই। অনুসরণ করতে দিলেন না কাউকে তিনি।

একটা আরামকেদারা রাখা সেখানে, জানালামুখী; একটা প্রশস্ত, স্বস্তিময় আরামকেদারা। ঢলে পড়লেন তাতে, শরীরটাকে চাপিয়ে দিলেন চেয়ারটায়; দেহটা ন্যুইয়ে পড়েছে শারীরিক অবসাদে, চেষ্টায় আছে মনটাকেও গ্রাস করার।

নিজের বাড়ির সামনের খোলা উঠোন, বসন্তের বাতাসে উদ্বেলিত গাছপালা; সবই দেখছিলেন তিনি। বৃষ্টির ভেজা গন্ধ ভাসছিল চারদিকে। নিচে রাস্তায় বেসাতি নিয়ে চিৎকার করে চলেছে এক ফেরিওয়ালা। দূরে কোথাও গাইতে থাকা কারো গান ক্ষীণভাবে ভেসে আসছিল তাঁর কানে, ঘরের ছাঁইচে কিচিরমিচির করছিল অসংখ্য চড়ুই।

পেঁজা তুলোর মতো মেঘের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছিল নীল আকাশটা; সেসবই দেখছিলেন তাঁর পশ্চিমমুখী জানালা দিয়ে।

চেয়ারের কুশনের উপর মাথা রেখে বসেছিলেন তিনি, বেশ নিস্পন্দভাবে; যতক্ষণ না কান্নার এক দমক এসে ধাক্কা দিল তাঁর গলায়।


সুন্দর, শান্ত এক মুখশ্রীর অধিকারী ছিলেন তিনি তারুণ বয়সে; যেটাতে ফরমায়েশী দমনের তেজ প্রকাশ পেত, একই সাথে দৃঢ় শক্তিরও। কিন্তু তাঁর চোখে এখন ফিকে দৃষ্টি, আটকে আছে ঐ অদূরের এক চিলতে নীল আকাশে। এই চাহনিতে কোনো বিচক্ষণতার রেশ ছিল না, বরং বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তাশক্তির স্থগিতাদেশের লক্ষণই ফুটে উঠেছিল সেখানে।

আগমনী বার্তা পাচ্ছিলেন তিনি কিছু একটার, তাঁর কাছে আসছে। তিনিও অপেক্ষা করে আছেন সেটির জন্য, ভীত-সন্ত্রস্তভাবে। কি সেটা? জানেন না তিনি; দুর্বোধ্য, অধরা, অস্পৃশ্যকে সংজ্ঞায়ন করবেনই বা কী করে! কিন্তু অনুভব করতে পারছিলেন, আশেপাশের রং-বর্ণ-গন্ধ সবকিছু ছাপিয়ে শূন্য থেকে ধেয়ে আসছে সেটি তাঁর দিকে, ধীরে ধীরে।
বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন তিনি হঠাৎ; চিনতে পেরেছেন, কে তাঁকে আচ্ছন্ন করতে চাইছে। সমস্ত শক্তি দিয়ে বিরোধিতা করতে থাকলেন তিনি, ফিরিয়ে দিতে চাইছেন তাকে, অবশ্য সেই শক্তির জোর তাঁর দুই রোগা, শুকনো হাতের মতোই ক্ষমতাশীল।

হাল ছেড়ে দিলেন এক সময়, চাপাস্বরে কিছু শব্দ বেরিয়ে এলো তাঁর মুখ থেকে; বারবার: ‘মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি!’ তাঁর চোখের ফাঁকা দৃষ্টিতে ভয়ের আভাস; ব্যগ্র, উজ্জ্বল হয়ে উঠল তা। নাড়ী-স্পন্দন বেড়ে গেল তাঁর, বহমান রক্তকণিকা উষ্ণতর হয়ে উঠল, নিস্তেজ হয়ে পড়ল শরীরের প্রতিটি অংশ।

তিনি জানতেন, আবার কান্নায় ভেঙে পড়বেন তিনি, যখন সেই অমায়িক, স্নেহময় হাতদুটোকে দেখবেন মৃত্যুর মোড়কে ঢাকা; সেই মুখখানা, যাতে মমতা, ভালবাসা ছাড়া অন্য কিছুই প্রকাশ পেত না তাঁর জন্য, সেটি থাকবে স্থির, ধূসর এবং মৃত। কিন্তু এই দুঃসহ সন্ধিক্ষণের আগে তো একটা দীর্ঘ সময় পার করে এসেছেন তিনি; সেইসব মুহূর্ত শুধুই তাঁর, একান্ত নিজের। হাতছানি দিয়ে সেসবকেই স্বাগত জানাচ্ছেন স্মৃতির পাতায়।

সামনের দিনগুলোতে অন্য কারো জন্য টিকে থাকতে হবে না তাঁকে, এখন থেকে নিজের জন্যই বেঁচে থাকবেন তিনি। কোনো বন্ধনে আবদ্ধ নন তিনি এখন, নেই কোনো অদৃশ্য সত্ত্বার অস্তিত্ব, যার বদৌলতে নর-নারীর অধিকার থাকে একে-অন্যের উপর নিজস্ব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার। উদ্দেশ্য মহৎ হোক অথবা রুক্ষ্ম; সেই মুহুর্তে এমন চিন্তা-ধারণা প্রশ্রয় দেয়াকে রীতিমত কোনো পাপের পর্যায়েই পড়ে।


তিনি কিন্তু ভালবাসতেন তাঁর স্বামীকে— কখনো, আবার কখনো নয়। কী আসে যায় তাতে! ভালবাসা, বরাবরই যা এক অমীমাংসীত রহস্য; নিজের সবকিছুর ওপর এর দখলদারিকেই হঠাৎ তাঁর কাছে মনে হচ্ছে তাঁর অস্তিত্বের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত!

‘মুক্তি! দেহের, আত্মার মুক্তি!’ মৃদু স্বরে বলতে থাকলেন তিনি।
জোসেফিন দরজার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে কী-হোলে মুখ রেখে বলতে থাকলেন: ‘লুইস, দরজাটা খোল দয়া করে। অসুস্থ বানাবে তো নিজেকে। কি করছ তুমি লুইস? ঈশ্বরের দোহাই দরজাটা খোল।’
‘যাও তুমি, অসুস্থ হব না আমি।’ জীবনের রূপ-রস পানে ডুবে আছেন তখন তিনি, খোলা জানালা দিয়ে।

খেয়ালী কল্পনাগুলো ছুটে বেড়াতে লাগল তাঁর স্মৃতিতে। বসন্ত, গ্রীস্মের দিনগুলো; যে মুহূর্তগুলো তাঁর একান্ত আপন। প্রার্থনা করলেন তিনি দীর্ঘায়ু জীবনের জন্য, অথচ গতকালও তিনি শিহরিত হতেন জীবনের স্থায়িত্বের ব্যাপারে ভেবে।
উঠে দাঁড়ালেন তিনি অবশেষে, বোনের জোরাজুরিতে দরজা খুললেন। তাঁর চোখে তখন জয়ের উত্তেজনা খেলা করছে, সাফল্যের দেবীকে যেন ধারণ করেছেন তাঁর শরীরে। বোনের বাহু আঁকড়ে ধরে নিচে নামতে থাকলেন তিনি, সিঁড়ির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে রিচার্ড।

সামনের দরজা খুলছেন কেউ একজন। আর কেউ নন, তিনি ব্রেন্টলি ম্যালার্ড; ভ্রমণের ক্লান্তি আর হাত-ব্যাগ ও ছাতা সাথে নিয়ে ঢুকলেন বাড়িতে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে ছিলেন তিনি, এমনকি জানতেনও না যে এরকম কিছু একটা ঘটেছে। অবাক হয়ে জোসেফিনের বাঁধভাঙা কান্না দেখছেন তিনি, আর তাঁকে আড়াল করার জন্য রিচার্ড দ্রুত সরে গেলেন, যাতে হঠাৎ তাঁর স্ত্রীর নজরে তিনি না পড়েন।
কিন্তু বেশ দেরী করে ফেলেছেন রিচার্ড।

ডাক্তার এসে বললেন যে, তিনি মারা গেছেন হৃদরোগেই— উচ্ছাসের তাড়নায় মৃত্যু ঘটেছে তাঁর।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...