এই তির-ধনুকে লক্ষ্য ভেদ করা যাবে না:​ সিপিডি

বাজেট বাস্তবায়নে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শঙ্কা

47

প্রস্তাবিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটের বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে ৮০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বিনিয়োগ লাগবে। সরকারকে বাড়তি প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা আয় বাড়াতে হবে। আর সরকারকে বাড়তি ব্যয় করতে হবে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এ তিনটি অর্জন করা গেলে ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সরকারের আয়কে ধনুক, ব্যয়কে তির এবং বাজেটের লক্ষ্যগুলোকে নিশানার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘আপনার যদি একটা লক্ষ্য থাকে, আর সেই লক্ষ্য যদি আপনি অর্জন করতে চান, তাহলে আপনার তির চালাতে হবে এবং তার জন্য একটা ধনুক থাকতে হবে। আমরা ধনুক-তিরে সেই শক্তি দেখতে পাচ্ছি না। এই তির-ধনুক দিয়ে লক্ষ্য ভেদ করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।’

বাজেট বাস্তবায়ন এবং অর্থায়ন-দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত আয় ও ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বলেও মনে করে সিপিডি। সংস্থাটি বলছে, বাজেটে ৭ দশমিক ২ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, সেটি দেশের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করাকে অসম্ভব কিছু বলেও মনে হয় না। তবে তা অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ এবং আয়-ব্যয় বৃদ্ধির পূর্বশর্ত পূরণ করতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।সেই বাজেটের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে গতকাল শুক্রবার সকালে তাৎক্ষণিক বাজেট পর্যালোচনা হিসেবে তা তুলে ধরা হয়। রাজধানীর গুলশানের লেক শোর হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে এ পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।

সিপিডি বলছে, ঘোষিত বাজেট মোটেই বড় বা বিরাট কোনো বাজেট নয়। বাজেটকে পর্যালোচনা করা হয় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সামর্থ্য ও জিডিপির অংশের বিবেচনার ভিত্তিতে। সেই বিবেচনায় অর্থনীতির আকার বাড়লে ব্যয়ও বাড়বে।

ঘোষিত বাজেটের মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, যদি একটি নীতি ঘোষণা করা হয় এবং সেই নীতি বাস্তবায়িত না হয়, তবে পরবর্তী নীতিটি যখন ঘোষিত হয়, সেটা বাস্তবায়নের জন্য যে চলকগুলো থাকে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে, তারা সেটার ওপর আস্থা কম রাখে। কারণ, তখন তারা মনে করে, এ রকম ঘোষণা তো অনেকবারই হয়। আর তখন নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।

সিপিডি তাদের পর্যালোচনায় ঘাটতি অর্থায়ন পূরণের পরিকল্পনার দুর্বলতার কথা বলেছে। সংস্থাটি
বলছে, বাজেট ঘাটতির ৬৮ শতাংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। বিদেশি ঋণ ব্যবহারের উদ্যোগ কম। যদি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বেশি ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যায়। সেটিই এখন হচ্ছে, সুদ বাবদ সরকারের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটের নতুন একটি বৈশিষ্ট্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে সিপিডির মূল্যায়নে। তাদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে অনুন্নয়ন ব্যয় বেড়ে গেছে। এটি এবারকার বাজেটের নতুন চরিত্র। আর এটি হয়েছে মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি এবং পুঁজিবাজারের জন্য ১৩ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ রাখার কারণে।

বাজেটে যেসব প্রাক্কলন করা হয়, পরবর্তীকালে সেগুলোর বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হওয়ার কারণে প্রাক্কলনও বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না বলে মনে করছে সিপিডি। ভারতের সঙ্গে তুলনা করে সংস্থাটি বলছে, ভারতে সরকার ব্যয়ের যে প্রাক্কলন করে, তার প্রায় ৯৩ শতাংশই বাস্তবায়িত হয়। সেখানে বাংলাদেশে বাস্তবায়নের হার সাড়ে ৮১ শতাংশ। প্রক্ষেপণের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেলে নীতির দক্ষতাও নষ্ট হয়ে যায়। তখন কেউ তা আর গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে না। তাই নীতি ঘোষণার পর তাতে আস্থা পেতে হলে ওই নীতিকে সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী হতে হয়।

বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সিপিডি বলেছে, উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেটকে একীভূত করা দরকার। এ ছাড়া বাজেট অগ্রগতি সম্পর্কে সংসদ ও জনগণকে আরও বেশি করে জানানো উচিত। সংশোধিত যে বাজেটটি করা হয়, সেটি অর্থবছর শুরুর প্রথম প্রান্তিকের মধ্যেই করা ফেলা দরকার।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ: প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার সমালোচনা করে সিপিডি বলেছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ অর্থবছরে এ খাতে গড়ে খরচ করা হয়েছে বাজেটের ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এবারের বাজেটে বরাদ্দই রাখা হয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে একটি কৃষিমূল্য নির্ধারণ কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করে সংস্থাটি।

প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দ সম্পর্কে সিপিডি বলেছে, জিডিপির অনুপাতে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ১ দশমিক ১ শতাংশ। এ বরাদ্দ স্বল্পোন্নত অনেক দেশের তুলনায় কম। প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, তবে তাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবছর সংশোধিত বাজেটে বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ কমলেও প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়ন কৌশলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ ১০ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা থাকলেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, জ্যেষ্ঠ নাগরিক, শিশু শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাড়লেও সেটিকে প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে মনে করে সিপিডি।

অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তব্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বললেওবিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল কী হবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি মন্তব্য করে সিপিডি বলছে, ব্যক্তি বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়বে না, প্রবৃদ্ধিও টেকসই হবে না।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দের সমালোচনা করেছে সিপিডি। সংস্থাটি বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ১৩ হাজার ১২১ কোটি টাকা এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের জন্য ২ হাজার কোটি টাকাবরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ আর্থিক খাতের এ দুটি ক্ষেত্রই খুবই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সেখানে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া সৎ করদাতাদের অর্থ দেওয়া কোনোভাবেই উচিত হবে না।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...