আফরোজা অদিতি’র দীর্ঘ কবিতা

196
bdtruenews24.com

প্রেমের দীর্ঘ কবিতা: এই বিজনে


মেয়ে:

দেখেছ প্রকৃতি কী সুন্দর সেজেছে।
ঐ যে দেখ দেখ ফুটেছে রঙিন ফুল
ডাকছে কোকিল, উড়ছে প্রজাপতি, শিমুল
ফুলের মধু খায় নীলটুনি। এস এইখানে,
এই বিজনে বসি দুজনে, বলি ভালোবাসার
অমল কথা। বাজাও তোমার বাঁশি।
সুরে সুরে আন্দোলিত হোক জীবন আমার।

ছেলে:

কী কথা বলব, কী সুর বাজাবো বলো !
কোন রঙে রাঙিয়ে বলব কথা,বলো।
কোন সাধনে সেধে সেধে,
বাঁধবো বল কোন বাঁধনে তোমায়

মেয়ে:

যে সুরে বাজাবে, যে বাঁধনে বাঁধবে তাতেই খুশি।
যা তোমার মনে আসে। তাই করবে তুমি।
আজ বলার দিন, আজ শোনার দিন। এই ফুরফুরে
হাওয়ায় ভেসে বেড়াবার দিন, ভালোবাসার দিন আজ
শুধু রঙের দিন, কবিতার দিন, সুরে সুরে গানের দিন
কী হলো ! কথা বলছো না যে। কিছু তো বলো

ছেলে:

তোমার চয়িত শব্দের মতো নও তো তুমি। তোমাকে
ছোঁয়া যায় না। তোমার কবিতায় তুমি কৃষ্ণের রাধিকা
কখনও চন্ডিদাসের রামী, কখনও বা চন্দ্রাবলী কিন্তু
বাস্তবে তুমি তা নও ! তোমার কবিতায় যেমন
তোমাকে সহজে পাওয়া যায় তেমন তো নও তুমি !
তুমি… তুমি…

মেয়ে:

আমি কী! কী আমি! আমি কী অছ্যুৎ!

ছেলে:

না,না। ছি! তুমি অছ্যুৎ নও। তুমি মানবীর পোশাকে
অধরা মায়া, ছায়া শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়াও তুমি
তুমি অধরা জোছনা, বাতাসে ছড়িয়ে যাওয়া ফুলরেণু
আমার ধরা-অধরার দূরত্বে অবস্থান তোমার
তুমি দেবী। তোমাকে পূজা করা যায়, তোমার
সৌন্দর্য সাগরের মতো ছুঁয়ে দেখা যায়
তোমাকে পাওয়া যায় না মানুষের মাঝে। তুমি থাক
একখানে তোমার মন অন্যখানে, তুমি আনমনা।
তোমাকে দেখলে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের লাবন্য,
মনে পড়ে নজরুলের তাহমিনা, মনে পড়ে নন্দিনী

মেয়ে:

কী যে বলো তার ঠিক নেই। কেন এমন মনে হয়
বলতে হবে তোমায়

ছেলে:

এই পদ্মার মতো স্বচ্ছ বহতা তুমি, শরতের মেঘের মতো
শুভ্র, সুন্দর তুমি, তুমি বর্ষার কদম, বসন্তের শিমুল,
কোকিলের কুহুতান, শালিক চড়াইয়ের ঘুম ভাঙানো সুর
তোমাকে শোনা যায়, ছোঁয়া যায় পাওয়া যায় না

মেয়ে:

না, না। এমন নই আমি। আমি দেবী নই। নই পাখি,
নই ফুল, আমি মানুষ। আমি একটু লিখি, কিন্তু অনন্য নই,
আমি অতি সাধারণ। এই যে আমার হাত, এইযে অধর
এই তো আমি… আমার সর্বাঙ্গ নিয়ে দাঁড়িয়ে। দেখ আমার
চোখে সেখানে ঝরে পড়ছে ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি
সর্বনাশের পথে’… তুমি এস তুমি এস

ছেলে:

এইজন্যই তো বলি, তুমি মানুষ নও, তুমি কবি।
তবে…

মেয়ে: কী তবে ?

ছেলে:

তুমি তোমার কবিতার মতো নও। তুমি ষড়ঋতুর মতো।
প্রকৃতির যেমন বর্ষায় একরূপ, শরতে অন্যরূপ, বসন্তে তো দিক
ভুলানো সুর জাগানিয়া এক দিগন্ত রেখা, যেখানে পৌঁছানো
যায় না। তুমিও তাই। শত চেষ্টাতেও পৌঁছুতে পারি না
তোমার কাছে আমি। কোথায় যেন থেকে যায় একটা বাধা

মেয়ে:

এমন করে বলো না। বুকের ভেতর কষ্টের তোলপাড়
বুঝতে পারো না তুমি! কেন এমন করে বলো। আমি
তো তোমারই জন্য সাজিয়েছি বাগান, তোমারই জন্য
ফুটিয়েছি ফুল, সুপেয় জলে কলস ভরি শুধু তোমারই জন্য।
তুমি এমন করে বললে ৯ দশমিক ৯ রিখটার স্কেলে
ধ্বসে পড়বে আমার বুকের পুরোটা জমিন ! তুমি এমন
করে বলো না

ছেলে:

তুমি কষ্ট পেয়ো না। যে সত্য প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো,
যে সত্য নক্ষত্রের মতো তাকে কী করে অস্বীকার করি বলো !
তোমার কবিতার শব্দাবলীর মতো তুমি তো নও।

মেয়ে:

আবারও সেই একই কথা !
তুমি কি বৃষ্টি না ঝরিয়ে থামবে না, অযথা প্রস্ফুটিত
ফুলগুলি ঝরাবে, শান্ত নদী অশান্ত করতে চাও কেন ?
কেন ঝড় তুলে প্রকৃতিকে লন্ডভন্ড করতে আগ্রহ তোমার
কতোবার বলবো আমি এমন নই !

ছেলে:

তুমিও এমন কথা বলো না। কোন ঝড় তুলে প্রকৃতিকে
অশান্ত করতে চাই না। উত্তাল তরঙ্গ এলে কেমনে নৌকা
বাইবো বলো, কেমনে গাইবো ভাটিয়ালী। দিন-যাপনের
মালা গাঁথবো কেমন করে !

মেয়ে: তাহলে?

ছেলে:

তাহলে বলে কোন কথা নাই। তুমি তো জানো, আমি
সবসময় শান্ত প্রকৃতি পছন্দ করি, পছন্দ করি বয়ে
যাওয়া ধীরস্রোতা নদীর কলতান, জোছনায় ভাটিয়ালী
আমার পছন্দ। আমার পছন্দ উঠানে মাদুর পেতে পুঁথিপাঠ।

মেয়ে: ব্যতিক্রম কী আমি?

ছেলে:

না, তুমি ব্যতিক্রম নও। তবুও তুমি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
আমার। ফুলের দিকে, চাঁদের দিকে, নদীর দিকে যেমন
চেয়ে থাকা যায় তেমনি তোমার দিকে শুধু চেয়ে থাকা যায়,
তোমার সঙ্গে কথা বলা যায়, তোমাকে নিয়ে আলোচনা-
সমালোচনা করা যায় না। তোমাকে শুধু আমার
ভাবা যায় কিন্তু আমার করে পাওয়া যায় না। তুমি কখনও
আমার হবে না জানি তবুও ভালোবাসি, তবুও কাছে আসি।
তবুও তোমার কবিতা পড়ি।

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: