আপনার এত তাড়াহুড়া কিসের? আপনি এ মামলা নিয়ে এতবেশি তাড়াহুড়া করছেন কেন?

465
আপনার এত তাড়াহুড়া কিসের

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন আসামি পক্ষের আইনজীবী। সেই সঙ্গে মামলাটিকে ইমাজিনারি বলেও আখ্যায়িত করেন তিনি। মামলার দুই আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরতে গিয়ে তাদের   আইনজীবী মো. আহসান উল্লাহ এ দাবি করেন। বৃহস্পতিবারের শুনানি শেষে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৩-২৫শে জানুয়ারি নির্ধারণ করেন। এর আগে সকালে বিশেষ আদালতে আসামি কাজী সলিমুুল হক ও শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরতে গেলে তাদের আইনজীবী আহসান উল্লাহকে বিচারক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, আপনি মামলার যুক্তিতর্ক শুরু না করে সবকিছু পড়া শুরু করলেন কেন? জবাবে আইনজীবী আহসান উল্লাহ বলেন, আমি সাক্ষীদের সাক্ষ্য জেরাসহ সবকিছু না পড়লে তো মাই লর্ড আপনাকে বাসায় গিয়ে পড়তে হবে। জবাবে বিচারক বলেন, আপনি মামলার নির্দিষ্ট করে পড়েন।

উত্তরে আইনজীবী আহসান উল্লাহ বলেন, যুক্তিতর্কের জন্য আমাকে সবই পড়তে হবে। আপনি যদি বলেন তাহলে আমি শুনানি বন্ধ করে দেব। জবাবে আদালত বলেন, আপনি নিজে এ মামলা শুনানি করার জন্য কি ওকালতনামা দিয়েছেন? শুনানির আগে ওকালতনামা দিতে হয়। তখন আইনজীবী বলেন, শুনানির জন্য ওকালতনামা দিতে হবে না। হাইকোর্টে আমি ডেথ রেফারেন্স মামলা পরিচালনা করি। প্রতি মাসে কমপক্ষে দুটি মৃত্যুদণ্ড মামলার শুনানি করে থাকি। ওখানে দরকার হয় না। এখানে প্রয়োজন হবে? জবাবে বিচারক বলেন, আমাদের বিচারিক আদালতে ওকালতনামার প্রয়োজন হয়। আহসান উল্লাহ বলেন, আমি অনুমতি নিয়ে শুনানিতে অংশ নিয়েছি এবং আপনি যদি মনে করেন তাহলে ওকালতনামা দেব। বিচারক বলেন, আপনি যুক্তিতর্ক শুরু করেন।

এ সময় আইনজীবী বলেন, বিজ্ঞ আদালত জাস্টিস হ্যারিড অ্যান্ড জাস্টিস ব্যারিড অর্থাৎ দ্রুত বিচার মানে ন্যায় বিচার বঞ্চিত হওয়া। মাই লর্ড আপনার এত তাড়াহুড়া কিসের? আপনি এ মামলা নিয়ে এতবেশি তাড়াহুড়া করছেন কেন? জবাবে বিচারক বলেন, আমি আপনাকে এ মামলার মূল বিষয়গুলো পড়তে বলছি। জবাবে আইনজীবী বলেন, আপনি এ মামলায় আমার আসামিদের জেলে রেখেছেন। হাইকোর্টে গেলে এ মামলা জামিন হয়ে যাবে। আপনি যা খুশি দণ্ড দেন। যাবজ্জীবন, ফাঁসি দেবেন। কোনো সমস্যা নেই। হাইকোর্র্টে আমি মৃত্যুদণ্ডের শুনানি করব। আপনি যা খুশি রায় দিতে পারেন। কারণ আপনার হাতে ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমাকে শুনানি করতে দিতে হবে। জবাবে বিচারক বলেন, ঠিক আছে আপনি শুনানি করেন। তবে আপনি মূল অংশে আসেন। আইনজীবী আহসান উল্লাহ বলেন, আমার ছোট আসামি বলে কি সময় কম হবে নাকি? আপনি একজনকে দশদিন শুনেছেন। আমার দুইজনের জন্য আমি বিশ দিন শুনানি করব। এ সময় আদালত বলেন, আপনি কোন আসামির পক্ষে শুনানি করবেন তা নির্ধারণ করতে হবে। এভাবে পুরো বিষয়টি আপনি শুনানি করতে পারেন না।

আইনজীবী বলেন, আদালতে পড়া যাবে না এটার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কোন আইনে আছে আমাকে দেখাতে পারলে আমি ওকালতি ছেড়ে দেব। সাক্ষ্য আইনের এ রকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এ সময় আদালত বলেন, আপনি কারপক্ষে শুনানি করতে চান? আইনজীবী বলেন, আমি দুই আসামির পক্ষে শুনানি করতে চাই। জবাবে আদালত বলেন, আপনি নির্দিষ্ট জায়গায় পড়েন। জবাবে আইনজীবী বলেন, আমার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। আমি মামলার এফআইর, চার্জশিট, জেরা, আসামিদের আত্মপক্ষের বক্তব্য (৩৪২)সহ ৩২ জন সাক্ষীর সব সাক্ষ্য পড়ব। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আসামিপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি এত দিন কোথায় ছিলেন? মূল জিনিস পড়েন। জবাবে আইনজীবী আহসান উল্লাহ বলেন, আমার সঙ্গে বিজ্ঞ আদালতের কথা হচ্ছে। আপনি এখানে কথা বলার কে? এ সময় আহসান উল্লাহ খুব উচ্চস্বরে বলেন, ‘মাইলর্ড আদালত কি আপনি চালান? নাকি পিপি (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী) চালায়? বিচারক নিরবতা পালন করলে পিপি মোশাররফ হোসেন কাজলও চুপ হয়ে যান। এ সময় আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে বিচারক পিপিকে কথা না বলে বসে যেতে বলেন। তারপর আহসান উল্লাহ তার দুই মক্কেলের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে শুনানি শুরু করেন। শুনানিতে তিনি সাক্ষীর দেয়া সাক্ষ্যের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো পুনরাবৃত্তি করেন।

আধ ঘণ্টার বিরতি শেষে ফের শুরু হয় আদালত। দিনের দ্বিতীয় পর্বের শুনানিতে আইনজীবী আহসান উল্লাহ বিচারকের উদ্দেশে বলেন, আমরা টুইংকল টুইংকল পড়ার সুযোগ পাইনি, পড়েছি শুভংকরের ফাঁকি। এখানে মামলায় শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। আদালতকে তিনি বলেন, প্রসিকিউশনের প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল একজন সেলিব্রেটি আইনজীবী। তিনি শুধু সেলিব্রেটিই নন, এ মামলায় তিনি যে সততা দেখিয়েছেন তা ইতিহাসে লেখা থাকবে। কারণ মামলায় বাদী পক্ষের ২৯ নম্বর সাক্ষী মো. ওমর কবীরের সাক্ষ্যটি তিনি রেখেছেন। ২৯ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্যে পরিষ্কারভাবে প্রমাণ হয়েছে ট্রাস্টের টাকা আত্মসাৎ তো হয়নি, কোনো অনিয়মও হয়নি। মামলাটি ইমাজিনারি। মামলায় প্রত্যেক সাক্ষীর সাক্ষ্য পড়তে না দেয়ায় আদালতের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখানে আসামিদের প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট অপরাধ চিহ্নিত করা হয়নি। সবার যোগসাজশে অপরাধ হয়ে থাকলে কেন সব সাক্ষীর সাক্ষ্য পড়তে পারব না? আমি হয়তো অনভিজ্ঞ, তাই ক্ষমা চাই। কিন্তু কোন আইনে সেটা বারণ আছে আমি দেখে আসব। আশাকরি, আপনিও দেখে নেবেন। কারণ চোখে বালি পড়লে তা বের না করা পর্যন্ত অস্বস্তিবোধ কাটে না। বিচারকের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস- আপনি হাইকোর্ট বিভাগ বা আপিল বিভাগে যাবেন। আশাকরি, ততদিন আমি বেঁছে থাকবো; তার আগে মরব না। গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত চলে আদালত।

শুনানি শেষে কাজী সলিমুল হক ও শরফুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী আহসান উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, এ মামলা ইমাজিনারি, হাস্যকর। যে মামলার গ্রাউন্ডই নেই সেই মামলাটি এতদিন কি করে চলল সেটাই একটি প্রশ্ন। তিনি বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার আসামি শরফুদ্দিনের কাছে ট্রাস্টের জমি কেনার জন্য বায়না করেছিল। নির্ধারিত অঙ্কের একটি অর্থও পরিশোধ করেছিল। কথা ছিল, জমিটা আরেকটু উন্নয়ন করে তারপর চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি বায়না করা হবে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার আগে দেশে ওয়ান ইলেভেনের অবৈধ সরকার আসে। দুদকের চেয়ারম্যান হন লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী। তার সময়ে দুদক ট্রাস্টের অর্থের ব্যাপারে মামলা করে দেয়। তারেক রহমানসহ ট্রাস্টিদের সবাই তখন কারাগারে। ফলে পরবর্তীতে বায়নাসহ জমি ক্রয়ের প্রক্রিয়াটি আর সম্পন্ন হয়নি। ফলে ট্রাস্ট বায়নার পরিশোধকৃত টাকাগুলো ফেরত চেয়ে একটি মানিস্যুট মামলা করলে জমির বিক্রেতা পক্ষ শরফুদ্দিন  পরিশোধকৃত অর্থের সুদসহ ব্যাংকে ফিরিয়ে দেন। ট্রাস্টের মূল অর্থ সোয়া দুই কোটি টাকা এখন সুদে-আসলে বেড়ে ছয় কোটি টাকার বেশি হয়েছে।

মামলার ২৯ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্যেই সেটা প্রমাণিত। ফলে এখানে ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ, চুরি বা কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। আহসান উল্লাহ বলেন, ওয়ান ইলেভেনের অবৈধ সরকারের আমলে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যানও অবৈধ। তার কার্যক্রমও অবৈধ বিবেচিত হয়েছে উচ্চ আদালতে। সে গ্রাউন্ডে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেকের মামলাই বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু এ মামলাটি বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে দুদকের প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আসামিপক্ষ নতুন নতুন আইনজীবী যুক্ত করছেন, নতুন নতুন যুক্তি দেখাচ্ছেন। কিন্তু মামলার গ্রাউন্ডের দিকে তারা যাচ্ছেন না। আসামিপক্ষ যত ইচ্ছা বলুক কিন্তু মামলাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবেন না। কারণ বিদেশ থেকে টাকাগুলো এনেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি টাকাগুলো প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে জমা দিয়েছেন। তারপর জিয়াউর রহমানের নামে দুইটি ট্রাস্ট করে টাকাগুলো বণ্টন ও হস্তান্তর করা হয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমান যে অর্ধেক টাকা নিয়েছিলেন তা দিয়ে বাগেরহাটে এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তার কার্যক্রম চলমান। ফলে তিনি মামলায় আসেননি। অন্যদিকে তারেক রহমান যে অর্ধেক টাকা নিয়েছেন তা দিয়ে তিনি কোনো এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেননি। ট্রাস্টের টাকা ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যাবে কেন? প্রতিষ্ঠা করলে তার হোল্ডিং নম্বর কত? মঈনুল রোডে তো কোনো এতিমখানা নেই। এখন যদি তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান দুই ভাই এতিম হিসেবে ওই টাকা আত্মসাৎ করে সেটা আলাদা কথা।

শুনানির পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, এটি প্রতিহিংসামূলক ও রাজনৈতিক মামলা। দুনিয়ার সব জায়গায় আমরা দেখেছি যারা বিরোধী দলে থাকে তাদের অত্যাচার নির্যাতনের জন্য এ ধরনের মামলা করা হয়। রাজনীতিবিদদের নামে অতীতেও এ ধরনের মামলা হয়েছে। এতে করে রাজনীতিবিদদের জনপ্রিয়তা বাড়ে। এই মামলায় বিএনপি ও খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা আরো বাড়বে। তিনি বলেন, যারা এই মামলা করেছেন তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে এই মামলার নথি সৃজন করা হয়েছে। তারা মূল নথি তৈরি করতে পারেন নি। ছায়া নথি তৈরি করেছেন। মওদুদ আহমদ বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি যে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন।

এর আগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় শুনানি  চলাকালে দুপুর ১২টায় বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত বিশেষ আদালতে পৌঁছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আগের দিন খালেদা জিয়ার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর কারণে বৃহস্পতিবার মামলার কার্যক্রম মুলতবির আবেদন জানিয়েছিলেন তার আইনজীবী। আদালত তাকে বৃহস্পতিবার হাজিরা থেকে রেহাই দিলেও মামলার কার্যক্রম চলবে বলে জানিয়ে দেন। আদালতের এমন সিদ্ধান্তের কারণে বৃহস্পতিবারের জন্য ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে রেহাই পেলেও আদালতে যান খালেদা জিয়া।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে বিদেশ থেকে আসা দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩রা জুলাই রমনা থানায় দুদক এ মামলা করে। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ই আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়। ২০১৪ সালের ১৯শে মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। মামলার অন্য আসামিরা হলেন- খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ। এ মামলায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ২৬শে জানুয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

শেয়ার করুন :
Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন:

Loading Facebook Comments ...