অমাবস্যার জোয়ারে ছয় উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত

কক্সবাজারে হাজারো মানুষের দুর্ভোগ

95
bdtruenews24.com

অমাবস্যার জোয়ারে কক্সবাজারের ছয় উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গত ২১ মের ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে বিলীন বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে উপকূলে এই নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ টি এম নুরুল বশর চৌধুরী বলেন, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে উপজেলায় প্রায় ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে ১২ হাজারের মতো ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের এত দিন পরও ভাঙা বেড়িবাঁধগুলো সংস্কার করা হয়নি। তিন দিন ধরে অমাবস্যার জোয়ারে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।

গত রোববার দুপুরে উপজেলার আলী আকবর ডেইল, বড়ঘোপ ও উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অমাবস্যার জোয়ারে শত শত ঘরবাড়ি প্লাবিত হচ্ছে। হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বজনদের বাড়িতে ছুটছে।

কাইছারপাড়ার লবণচাষি আজগর আলী বলেন, রোয়ানুর আঘাতে তাঁর মাটির ঘর ভেঙে গেছে। সাত দিন আগে ধারদেনা করে তিনি একটি কাঁচা বাড়ি তৈরি করেন। কিন্তু দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা জোয়ার লেগে থাকায় সেই ঘরেও থাকা যাচ্ছে না।

উত্তর ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহরিয়ার চৌধুরী জানান, রোয়ানুর প্রভাবে বিলীন কয়েক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। কিছু ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে।

বড়ঘোপ ইউপির চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, জোয়ারে ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। আলী আকবর ডেইল ইউপির চেয়ারম্যান নুরুচ্ছাফা জানান, জোয়ারে ইউনিয়নের কুমিরারছড়া, জেলেপাড়া, আনিচের ডেইল, পূর্ব তাবলেরচর, পশ্চিম তাবলেরচর, হায়দারবাপেরপাড়া, তেলিপাড়া, কাহারপাড়া ও কাজিরপাড়া প্লাবিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাবিবুর রহমান জানান, ২১ মের ঘূর্ণিঝড়ে জেলায় প্রায় ৮২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়িবাঁধ ভেঙেছে কুতুবদিয়ায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই ভাঙা বাঁধের সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। এতে অমাবস্যার জোয়ারে ছয়টি উপজেলার প্রায় ৫৪টি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে ভাঙা বেড়িবাঁধের সংস্কার সম্ভব নয়। কারণ এ সময় সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকে।

এদিকে জোয়ারে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পাউবোর টেকনাফের উপসহকারী প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন জানান, ২০১২ সালের ২২ জুলাই শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া অংশের বাঁধ জোয়ারের আঘাতে ভেঙে যায়। এর মধ্যে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে মহেশখালীর মাতারবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকা। গতকাল দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলোরোয়ানুর আঘাতে আরও তিনটি অংশে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ১৫টি গ্রাম জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, রোববার দিবাগত রাত থেকে বঙ্গোপসাগরে অস্বাভাবিক জোয়ার শুরু হয়। যার উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার ফুট বেশি।

গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, শাহপরীর দ্বীপের ঘোলাপাড়া এলাকায় বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকছে। বাড়ির লোকজন ঘরে তালা লাগিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।

সাবরাং ইউপির চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, অস্বাভাবিক জোয়ারে তাঁর ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ১৫ গ্রামের ডুবে যাওয়া বেশির ভাগ বাড়িতে চুলায় আগুন দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জোয়ারে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ও ধলঘাট ইউনিয়নের ২৮ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। রোয়ানুতে ধলঘাট ও মাতারবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ায় ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

ধলঘাট ইউনিয়নের সরইতলার বাসিন্দা আবুল কাছিম বলেন, জোয়ারের পানির কারণে রান্নাঘরে আগুন জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে অনেকেই না খেয়ে আছে।
ধলঘাট ইউপির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান বলেন, দ্রুত ব্লক দিয়ে টেকসই বেড়িবাঁধ না করলে পুরো এলাকা সাগরে তলিয়ে যাবে।

মাতারবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

Follow Facebook

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন: